জলকপাটে বোরো-বাঁধের টানাটানি
তাহিরপুর
তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
হাওরে বোরো ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শুরু করতে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের পক্ষে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। কিন্তু জমির ধান চাষের স্বার্থে জলকপাট (স্লুইসগেট) বন্ধ রেখে পানি ধরে রাখার দাবিতে অনড় স্থানীয় কৃষক ও হাওর কমিটি। এ দুই পক্ষের টানাটানিতে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে বোরো আবাদ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
হাওর উন্নয়ন কমিটির নেতাদের অভিযোগ, পাউবোর কারিগরি আপত্তির কারণে মাটিয়ান হাওরের গুরুত্বপূর্ণ জলকপাট সময়মতো লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। যার ফলে সেচ সংকটের
মুখে পড়েছেন কৃষকরা। মাটিয়ান হাওর উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হাওরে যদি ফসলই না হয়, তাহলে ফসল রক্ষা বাঁধ দিয়ে কী হবে? পাউবো কর্মকর্তারা বলছেন, হাওরের পানি দ্রুত সরে গেলে তারা বাঁধের কাজ শুরু করতে পারবেন। অথচ ধানের চারা রোপণের উপযুক্ত বয়স (কমপক্ষে ৪০ দিন) এখনও হয়নি।
প্রতিবছর মাটিয়ান হাওরে ধান চাষের স্বার্থে ধানের চারা রোপণ উপযোগী না হওয়া পর্যন্ত ১০-১২ দিন জলকপাট বন্ধ রাখা হয়। এলাকার বাস্তবতা বিবেচনায় হাওর কমিটির পক্ষ থেকেই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু চলতি বছর পাউবোর আপত্তির কারণে সে পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি।
মাটিয়ান হাওরপাড়ের কৃষক এবং বড়দল গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মুছিহুর রহমান মিলন একই সুরে বলেন, জমিতে যদি ধান রোপণই করতে না পারি, তাহলে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ দিয়ে কী লাভ হবে? কৃষকদের দাবি, পাউবো যেন বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি ফসল উৎপাদনের বিষয়কেও সমান গুরুত্ব দেয় এবং জলকপাট স্থাপনের মাধ্যমে জমিতে প্রয়োজনীয় পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করে।
চলমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় কৃষক প্রতিনিধিদের প্রশ্ন, কাদের স্বার্থে হাওরে বাঁধ দেওয়া হবে? ফসলই যদি রক্ষা না হয়, বাঁধের কাজের প্রাসঙ্গিকতা কী? জানা গেছে, বর্তমানে হাওরবেষ্টিত উপজেলার এ অংশে বাঁধের কাজ ও বোরো আবাদের মতো
দুটি প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্র রয়েছে সাংঘর্ষিক অবস্থানে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সঙ্গে কৃষকদের জলকপাট নিয়ে চলমান বিরোধ আরও জোরালো হয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, সেচের অপ্রতুল ব্যবস্থার মধ্যে সময়মতো গেট বন্ধ না হলে বোরো ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হবে।
মাটিয়ান হাওর উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হাওরে পানি সেচের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। ধানের চারার বয়স এখনও এক মাস হয়নি। এ অবস্থায় এখনই জরুরি ভিত্তিতে জলকপাট বন্ধ করতে বিলম্ব হলে বোরো ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হবে।
বড়দল গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলাম হাওরের ফসল উৎপাদনের স্বার্থে কৃষকদের সুবিধা বিবেচনা করে মাটিয়ান হাওরের জলকপাট আগামী ১০ দিনের জন্য বন্ধ রাখতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণে প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।
কৃষি বিভাগের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, হাওরের তিন মাসের কৃষিকাজের সময়েও কৃষি অফিসের মাঠকর্মীদের বিগত এক বছরে হাওরে যেতে দেখা যায়নি।
অন্যদিকে কৃষকদের চাপের মুখে কিছুটা নমনীয় হয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এর উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনির হোসেন জানিয়েছেন, হাওরপাড়ের কৃষকদের স্বার্থে মাটিয়ান হাওরের চারটি জলকপাটের মধ্যে দুটি দ্রুত সময়ের মধ্যেই লাগিয়ে দেওয়া হবে। তাঁর দাবি, দুটি কপাট দিয়ে হাওরের পানি সরলে কৃষকদের আর কোনো সমস্যা হবে না। প্রতি বছর বোরো মৌসুমে হাওরে যেন জলাবদ্ধতা না হয় সে লক্ষ্যে আমরা কৃষকদের পরামর্শ নিয়ে জলকপাটের কাজ করব। তবে কৃষকদের শঙ্কা, পুরো কপাট বন্ধ না হলে প্রয়োজনীয় পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে না এবং সেচ সংকট তীব্র আকার ধারণ করবে।
- বিষয় :
- পাউবো
