শর্তের বেড়াজালে আটকা পঞ্চগড় চিনিকল
অযত্নে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান যন্ত্রাংশ
সফিকুল আলম, পঞ্চগড়
প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
পঞ্চগড় চিনিকল একসময় ছিল উত্তরের শিল্প-স্বপ্নের আলোকশিখা। আজ তা দাঁড়িয়ে আছে নীরব, ভঙ্গুর, পরিত্যক্ত প্রহরীর মতো। আখ চাষের শর্ত, প্রশাসনিক জটিলতা ও অব্যবস্থাপনার বেড়াজালে বন্ধ হয়ে গেছে এর চাকা। অযত্নে নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রাংশ, হারিয়ে যাচ্ছে কর্মসংস্থান, মলিন হয়ে যাচ্ছে এক জেলার অর্থনৈতিক ইতিহাস।
সরেজমিনে চিনিকল ঘুরে দেখা গেছে, অনেক দিন ধরে বন্ধ মিলের ভেতরে সুনসান নীরবতা। একসময় যেখানে দিনের পর দিন আখ মাড়াই চলত, এখন সেই জায়গা জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। কার্যালয় চালু থাকলেও কারখানা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ভেতরে বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা ফাইলপত্র নিয়ে ব্যস্ত। মূল ফটকে দুইজন নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। প্রশাসনিক ভবনের সামনেই কারখানা এলাকা। চারদিকে ঝোপঝাড়। ভেতরে পড়ে আছে মরিচা ধরা যন্ত্রাংশ। কলোনিগুলো খালি পড়ে আছে। সন্ধ্যার পর এলাকা একেবারে নির্জন হয়ে পড়ে।
একসময় এ শিল্প ঘিরে শুধু শ্রমিক-কর্মচারীই ছিল দেড় হাজারের বেশি। এখন সর্বসাকল্যে আছেন ৩২ জন। শ্রমিকদের অনেকে চাকরি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ দোকান দিয়েছেন, আবার অনেকেই বেকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
এরপরও সাধারণ মানুষ, শ্রমিক ও চাষিরা এখনও আশা করছেন, একদিন মিল আবারও চালু হবে, ফিরে আসবে কর্মসংস্থান, জেগে উঠবে পঞ্চগড়ের শিল্পক্ষেত্র।
চিনিকলের ইতিহাস
১৯৬৫ সালে ১৯৮ একর জমিতে স্থাপন করা হয় এই চিনিকল। ১৯৬৯ সালে শুরু হয় চিনি উৎপাদন। দীর্ঘ কয়েক দশক এখানে গড়ে বছরে ৮,৫০০ টন চিনি তৈরি হতো। দেড় হাজার মানুষ সরাসরি চাকরি পেতেন। চাষিসহ প্রায় ৪০ হাজার মানুষের জীবিকা ছিল এই মিলকে ঘিরে। ২০০৫ সালের পর থেকে লোকসান বাড়তে থাকে। ২০২০ সালে মিলটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
চিনিকলের অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক, কর্মকর্তা, কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি নাইবুল হক বলেন, অবসরের ৯০ দিনের মধ্যে গ্রাচুইটির টাকা পাওয়ার কথা। আট বছর ধরে ঘুরছি। এখন পাওনা টাকার জন্য আন্দোলন করা ছাড়া উপায় নেই।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে জেলায় ৩১টি আখ ক্রয়কেন্দ্র আছে। তার মধ্যে চালু মাত্র ৮টি। এখন প্রায় ৯০০ একর জমিতে আখ চাষ হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, মিল চালু করতে হলে কমপক্ষে ৩,০০০ একর জমিতে আখ লাগাতে হবে। চাষ বাড়ানোর মতো উদ্যোগ নেই। পঞ্চগড়ের পরিবর্তে আখ তদারকি করছে ঠাকুরগাঁও চিনিকল। নতুন সরকার মিল চালুর সিদ্ধান্ত নিলেও জেলায় পর্যাপ্ত আখ নেই–এ কারণে উদ্যোগটি আটকে আছে কাগজে-কলমে।
সদরের আখচাষি কাজী ফারুক আহাম্মেদ বলেন, এবার সাত একর জমিতে আখ চাষ করেছি। ফলনও হয়েছে ভালো। এই আখ এখন ঠাকুরগাঁও চিনিকলে দিতে হবে। পঞ্চগড় চিনিকল চালু হলে আখ চাষ বাড়বে। এখন শুধু সরকারি তদারকি দরকার।
চিনিকলের উপ-ব্যবস্থাপক (কৃষি) ফরিদুল আলম আলম বলেন, জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩১টি আখ ক্রয়কেন্দ্রের মধ্যে আটটি চালু রয়েছে। আখ চাষ হয়েছে প্রায় সাড়ে আটশ একর জমিতে।
জেলায় এখনও প্রচুর জমি আছে, যেখানে আখ চাষ করা যাবে। ১,৫০০ থেকে ২,০০০ একর জমিতে আখ লাগাতে পারলে মিল চালু হতে পারে।
এ বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাইফুল ইসলামের ভাষ্য, ‘২০২০ সালে সরকারের নির্দেশে পঞ্চগড় চিনিকলে আখ মাড়াই কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছিল। এখন সেই আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর চেয়ে বেশি কোনো বক্তব্য আমার নেই।’
পঞ্চগড় চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সিনিয়র সহসভাপতি আবু হিরন বলেন, ‘একসময় পঞ্চগড় চিনিকল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছিল। কারখানাটি বন্ধের ফলে শ্রমিক-কর্মচারীসহ হাজার হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। এটি চালু হলে জেলার অর্থনীতি ফের জাগবে। চা ও পাথরের মতো আখও হবে পঞ্চগড়ের আরেক শক্তি।’
- বিষয় :
- চিনিকল
