ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ৭০ শতাংশই শক সিনড্রোমে

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ৭০ শতাংশই শক সিনড্রোমে
×

 শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম 

প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইফফাত নূর তানভীর। চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহরের তেল্লা পুকুরপাড় এলাকার বাসিন্দা ছিলেন ২৮ বছরের এ তরুণ। সম্প্রতি তাঁর জ্বরসহ নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। এক পর্যায়ে নেওয়া হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। সেখানে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মারা যান তিনি। ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের কারণে তাঁর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেন চিকিৎসকরা। বিয়ের মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় এমন মৃত্যু কাঁদিয়েছে অনেককে। 

তানভীরের মতোই চট্টগ্রামে এ বছর প্রায় ৭০ শতাংশ ডেঙ্গু আক্রান্তের মৃত্যু হয়েছে শক সিনড্রোমে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ডেঙ্গুর চারটি ধরনের মধ্যে বেশি ভয়ংকর ‘শক সিনড্রোম’। এতে রোগীর শরীরে দ্রুত রক্তচাপ ও রক্তে অনুচক্রিকার পরিমাণ কমে যায়। শরীরে তরল ব্যবস্থাপনার (ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট) জটিলতা দেখা দেয়। কোষে বন্ধ হয়ে যায় অক্সিজেন চলাচলও। তৈরি হয় পানিশূন্যতা। এ কারণে অনেকে অচেতন হয়ে পড়েন।

ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে মারা যাওয়াদের তালিকায় আছেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের বাসিন্দা ৪৮ বছর বয়সী নাসিমা আক্তার। টানা কয়েক দিন জ্বরের সঙ্গে শরীরে নানা জটিলতা দেখা দেওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। পরে তাঁর ডেঙ্গু পজিটিভ শনাক্ত হয়। এরপর দ্রুত খারাপ হতে থাকে তাঁর শারীরিক অবস্থা। হাসপাতালে ভর্তির এক দিনের মাথায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এ নারী। 
এ মৃত্যুর তালিকায় আরও আছেন নগরের বাকলিয়া এলাকার বাসিন্দা ফরিদ আহমেদ (৩৯), ছোবহানবাগ ওয়ার্ডের শেবু চরণ ভৌমিক (৭৪), বড় কুমিরা এলাকার নাহিদা আক্তার (২৭), সিরাজউদ্দৌলা রোডের তাহসিন আজমি (২৮), সিতলপুরের মদনহাট এলাকার নাদিয়া জান্নাত তাসকিয়া (১০), পটিয়া উপজেলার নুরুল আলম (৬৫), সীতাকুণ্ড চৌধুরীপাড়ার কলেজ রোডের বাসিন্দা মুসলেহ শাফী (২০), দুখী চাকমা (৪৯), ১৬ বছরের জয় তারাসহ অন্তত ২০ জন। 

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এএসএম লুৎফুল কবির শিমুল বলেন, ‘ডেঙ্গু আক্রান্তের যখন প্লাজমা লিকেজ হতে শুরু হয়, তখন রক্তচাপ কমে যায়। এক পর্যায়ে দ্রুত সময়ের ব্যবধানে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এটাই ডেঙ্গু শক সিনড্রোম।’ তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গুর এ ধরনটিতে আক্রান্ত রোগীর সার্বিক অবস্থা দ্রুত জটিল হয়ে যায়। আগে থেকে কিডনি, ডায়াবেটিস, হরমোনসহ নানা রোগে আক্রান্তদের এটি অল্প সময়েই কাবু করে ফেলে। ফলে বাঁচানো যায় না।’ 
ডেঙ্গু নিয়ে একাধিক গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী বলেন, ‘এবার শক সিনড্রোমে বেশির ভাগ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এটি হলে মানবকোষে অক্সিজেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মস্তিষ্ক, হার্ট ও কিডনিতে রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছাতে না পেরে অঙ্গগুলো ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এ কারণে রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।’

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছর এ পর্যন্ত রেকর্ড চার হাজার ৮৩৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে দুই হাজার ৫১১ জন পুরুষ, এক হাজার ৪৩২ জন নারী ও শিশু ৮৯১ জন। মৃত্যু হয়েছে ২৬ জনের। এর মধ্যে ১৪ জন পুরুষ, সাত নারী ও পাঁচ শিশু। মোট মৃত্যুর মধ্যে ২০ জনের প্রাণ গেছে শক সিনড্রোমে, যা শতাংশের হারে ৭০ শতাংশের বেশি। ২৪ জনেরই প্রাণ গেছে গেল পাঁচ মাসে। মোট আক্রান্তের এক হাজার সাতজন নভেম্বর মাসে, যা ১২ মাসে সর্বোচ্চ। এখন অর্ধশতজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
চট্টগ্রাম শহরে মশা বাড়ার জন্য সিটি করপোরেশনের দায় দেখছেন অনেকে। এ প্রসঙ্গে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘নগরে ডেঙ্গুর প্রকোপ কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ। মশার প্রজননস্থল, মৌসুমি ও জলবায়ুগত প্রভাব, নগরের অবকাঠামো ও মানুষের আচরণ– এসব বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ না করলে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম দীর্ঘ মেয়াদে সফল হবে না। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে ডেঙ্গুমুক্ত করতে হবে।’

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এ বছর শক সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তির এক থেকে দুদিন, এমনকি কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেও বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। এ জন্য অসচেতনতাও দায়ী। কারণ, এমন অনেক রোগী পেয়েছি, যারা আক্রান্ত হওয়ার পরও সঠিক সময়ে চিকিৎসা নেননি।’ 
চমেক হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, ‘আইসিইউতে আনার অল্প সময়ের মধ্যে শক সিনড্রোমে আক্রান্ত বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে।’

আরও পড়ুন

×