অনীক দত্তের চলচ্চিত্র বেঁচে থাকবে
অনীক দত্ত [২২ মে ১৯৬০–২৭ মে ২০২৬]
রহমান লেনিন
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৭:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পর আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায় তারা শুধু শিল্পী ছিলেন না, আমাদের সময়ের অনুভূতির ভেতরেই তারা নীরবে বসবাস করতেন। চলচ্চিত্র পরিচালক অনীক দত্ত তেমনই একজন নির্মাতা। তাঁর কাজ কেবল বিনোদন নয়, এক ধরনের সাংস্কৃতিক ভাষা; যা একইসঙ্গে হাসায়-ভাবায় এবং সমাজকে নতুন চোখে দেখতে বাধ্য করে। বাংলা চলচ্চিত্রে ব্যঙ্গ রসবোধ ও সামাজিক পর্যবেক্ষণের যে শূন্যতা একসময় তৈরি হয়েছিল অনীক দত্ত তা নতুন করে ফিরিয়ে আনেন। বিশেষ করে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্যাটায়ার হয়ে ওঠে। এই চলচ্চিত্র কেবল ভৌতিক কমেডি নয়, বরং সময়-সমাজ-স্মৃতি এবং মানুষের নৈতিক সংকটকে নিয়ে নির্মিত এক তীক্ষ্ণ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। হাস্যরসের আড়ালে তিনি সংস্কার রাজনীতি শ্রেণিবিভাজন ও শহরের পরিবর্তিত বাস্তবতাকে এমনভাবে তুলে ধরেন, যেখানে দর্শক একদিকে হাসে আর অন্যদিকে নিজের সমাজকে নতুন করে চিনতে পারে। তিনি কখনও সহজ জনপ্রিয়তার পথে হাঁটেননি। চমক বা অতিরিক্ততার বদলে তিনি ভরসা করেছেন গল্প পর্যবেক্ষণ এবং মানবিক রসবোধের ওপর। তিনি চলচ্চিত্রের গল্পে কৃত্রিম চমক তৈরি না করে ধীরে ধীরে দর্শকের ভেতরে ঢুকে পড়েন এবং একসময় ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেন। ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ চলচ্চিত্রে তিনি আধুনিক ভোগবাদ ও লোভের এক জটিল এবং দ্ব্যর্থক বাস্তবতা উন্মোচন করেছেন। হাস্যরসের আড়ালে এখানে ধরা পড়ে মানুষের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার এক সীমাহীন, ক্লান্তিহীন দৌড়। একটি শক্তিশালী রূপকের মাধ্যমে তিনি সমকালীন সমাজের ভেতরের শূন্যতা এবং অবিরাম অতৃপ্তিকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীরভাবে প্রকাশ করেছেন। ‘মেঘে ঢাকা তারা’ চলচ্চিত্রে তিনি ঋত্বিক ঘটকের নির্মিত ক্ল্যাসিক ট্র্যাজেডিকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করেছেন। এখানে কেবল পুনর্নির্মাণ নয়, বরং একটি সংলাপ তৈরি হয় অতীত ও বর্তমানের মধ্যে। শিল্পীর ভেতরের যন্ত্রণা, স্মৃতির ভার এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের নিজস্ব দ্বন্দ্ব একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে গভীর আবহ তৈরি করেছেন। ‘অপরাজিত’ চলচ্চিত্রে তিনি সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টিশীল পথচলার ভেতরে প্রবেশ করেন, যেখানে শিল্পী হয়ে ওঠেন অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে চলচ্চিত্র নিজেই এক ধরনের আত্মচিন্তার ক্ষেত্র হিসেবে দাঁড়ায়। সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টিশীল সংগ্রামকে তিনি এমন মমতায় নির্মাণ করেছেন, যেন পুরো চলচ্চিত্রটি এক শিল্পীর প্রতি আরেক শিল্পীর ভালোবাসার চিঠি। এ সিনেমার মাধ্যমে যেন তিনি সত্যজিৎ রায়কে জীবন্ত করে তুলেছেন। এই তিনটি চলচ্চিত্র মিলিয়ে বোঝা যায় অনীক দত্তের সিনেমা কেবল গল্প নয়; সমাজ, ইতিহাস এবং শিল্পের সঙ্গে এক ধারাবাহিক সংলাপ। তিনি একদিকে ব্যঙ্গ করেন, অন্যদিকে গভীরভাবে ভালোবাসেন, আবার একইসঙ্গে প্রশ্নও তোলেন। পুরোনো শহর, আলোছায়া সাধারণ জিনিস এবং নীরব মুহূর্তের মধ্যেই তিনি মানুষের অনুভূতির গভীর অর্থ খুঁজে পান। তিনি যেন বারবার মনে করিয়ে দেন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গল্পগুলো বড় কোনো ঘটনার মধ্যে ঘটে না; প্রতিদিনের ছোট ছোট মুহূর্তের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। আজ কলকাতার সিনেমায় নতুন নতুন চেষ্টা থাকলেও সেই সময়ের মতো তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ও ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টি খুব কমই দেখা যায়। হাসির আড়ালে তিনি সমাজের সেই গভীর সত্যকে রুপালি পর্দায় তুলে ধরেছেন। অনীক দত্তের চলচ্চিত্র ভবিষ্যতেও বেঁচে থাকবে। কারণ তাঁর সিনেমা কেবল বিনোদন নয়, এর গল্প স্মৃতি, সমাজ এবং সংস্কৃতির অংশ। তাঁর নির্মিত ভূতেরা হয়তো কলকাতার পুরোনো দালানেই ঘুরে বেড়াবে আর মনে করিয়ে দেবে এই শহর শুধু কংক্রিটের নয়; এই শহর স্মৃতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের অনুভূতি দিয়েও তৈরি হয়েছে।
লেখক: চলচ্চিত্রকর্মী ও নির্মাতা
- বিষয় :
- বিনোদন
