মনোনয়নবঞ্চিত চাচা-ভাতিজার ঐক্যে চাপে বিএনপি প্রার্থী
নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসন
সফুরউদ্দিন প্রভাত, আড়াইহাজার (নারায়ণগঞ্জ)
প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৪:১১ | আপডেট: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৪:১৩
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনে বিএনপির রাজনীতিতে মেরুকরণ শুরু হয়েছে। এখানে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ঢাকা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়ে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুর। তাঁর ভাতিজা বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহঅর্থনৈতিক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান সুমন মনোনয়ন ফরম কিনলেও জমা দেবেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি চাচার পক্ষে কাজ করবেন নাকি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে থাকবেন তা নিয়ে নানারকম আলোচনা আছে স্থানীয় রাজনীতিতে। যদিও দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে গিয়ে চাচার পক্ষে কাজ করার বিষয়টি নাকচ করেছেন মাহমুদুর রহমান সুমন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের অনুসারীরা যদি স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন, তাহলে নির্বাচনে বড় ধরনের চাপে পড়তে পারেন স্থানীয় বিএনপির প্রার্থী। তাছাড়া আওয়ামী লীগ যেহেতু নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না, তাই যিনি তাদের ভোট পাবেন তাঁর জয় পাওয়া সহজ হবে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ১৯৭৩ সালে নারায়ণগঞ্জ-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সফর আলী মিয়া সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে বিএনপি থেকে নির্বাচিত হন সামছুল হক। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত হন আব্দুল আওয়াল। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ (১৫ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচিত হন আতাউর রহমান আঙ্গুর। ১৯৯৬ সালে সদ্য জাতীয় পার্টি থেকে যোগ দেওয়া এমদাদুল হক ভূঁইয়া নির্বাচিত হলেও কারচুপির অভিযোগে আদালতে মামলা করেন বিএনপির প্রার্থী আতাউর রহমান আঙ্গুর। পরে তাঁকে ৫৯৫ ভোটে বিজয়ী ঘোষণা করেন আদালত। এর বিরুদ্ধে আপিল করলে তা নিষ্পত্তি হতে হতে সংসদের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী আতাউর আঙ্গুর নির্বাচিত হয়ে আসনটি পুনরুদ্ধার করেন। আস্তে আস্তে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি পায় এই উপজেলা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আঙ্গুরের সহোদর প্রয়াত এ এম বদরুজ্জামান খসরুকে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। ওই নির্বাচনে ৩৮ হাজার ৭৬০ ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বাবু। বিএনপির নেতাকর্মীরা তখন অভিযোগ করেন, বদরুজ্জামান খসরুর বিরুদ্ধে তাঁর ভাই আতাউর রহমান খান আঙ্গুরের গোপনে কাজ করার কারণে বিএনপির ভরাডুবি ঘটে। ফাটল ধরে বিএনপির দুর্গে। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নজরুল ইসলাম বাবু। ২০১৮ সালে বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদকে হারিয়ে ফের সংসদ সদস্য হন তিনি।
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপির দখলে চলে যায় উপজেলাটি। নজরুল ইসলাম আজাদের নেতৃত্বে সুসংগঠিত হতে থাকে উপজেলা বিএনপি। তাঁর অনুসারীদের একটি অংশের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা থাকলেও দল ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রাথমিকভাবে নজরুল ইসলাম আজাদকেই প্রার্থী ঘোষণা করে। এর পর থেকে মনোনয়ন পরিবর্তনের জন্য একাট্টা অবস্থান নেন মনোনয়নবঞ্চিত বিএনপির সহঅর্থনৈতিক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান সুমন, সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুর, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা বিএনপির সভাপতি নুরুল ইসলাম নুরু ও কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক পারভীন আক্তার। দল শেষ পর্যন্ত নজরুল ইসলাম আজাদকেই চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে গত ২৪ ডিসেম্বর মাহমুদুর রহমান সুমন ও ২৩ ডিসেম্বর তাঁর চাচা আতাউর রহমান আঙ্গুর মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। অনুসারীদের চাপে দেড় যুগের পারিবারিক বিরোধ মীমাংসা করে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেন চাচা-ভাতিজা। শেষ পর্যন্ত বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদের বিপক্ষে চাচা-ভাতিজার ঐক্য টিকবে কিনা তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদ জানান, বিএনপি বড় দল, তাই প্রার্থী অনেক থাকবে, প্রতিযোগিতা থাকবে। দলের বাইরে গিয়ে যারা মনোনয়ন ফরম তুলেছেন, তিনি আশা করছেন, তারা সময়মতো দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেবেন। এর পরও কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হলে তিনি আশাবাদী, বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জনগণ তাঁকেই ভোট দিয়ে বিজয়ী করবেন।
দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করার বিষয়ে সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুরের ভাষ্য, তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন তিনি। বিগত সরকারের আমলে আন্দোলন-সংগ্রাম করেও দলের কাছে অবমূল্যায়িত তিনি। তাই জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহঅর্থনৈতিক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান সুমন বলেন, মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলেও জমা দিচ্ছেন না। একে প্রত্যাহারও বলা যায়। মনোনয়ন পরিবর্তনের জন্য চাচা আতাউর রহমান আঙ্গুরের সঙ্গে আন্দোলন করেছেন। চাচা স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও দলের বিপক্ষে গিয়ে তাঁর পক্ষে কাজ করার বিষয়টি নাকচ করেন তিনি।
এই আসনে আরও প্রার্থী হয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা জামায়াতে ইসলামীর সমাজকল্যাণ সম্পাদক অধ্যাপক ইলিয়াস মোল্লা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রার্থী হাফিজুল ইসলাম, জাপার জি এম কাদেরের অংশ থেকে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন আলমগীর সিকদার লোটন, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের মো. হাবিবুল্লাহ, বাংলাদেশ রিপাবলিক পার্টি চেয়ারম্যান আবু হানিফ হৃদয়, গণঅধিকার পরিষদের উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব কামরুল মিয়া। এ ছাড়া মেহেদী হাসান, আব্দুল খালেক ও আব্দুল আউয়াল নামে আরও তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন।
অধ্যাপক ইলিয়াছ মোল্লা বলেন, এবারের নির্বাচনে ভোটাররা সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করতে মুখিয়ে আছে। জামায়াত সব সময় সত্য ও ন্যায়ের পথে ছিল। তাই জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাকে বেছে নিতে হবে, তা আড়াইহাজারবাসী জানেন।
স্থানীয় ভোটারদের ভাষ্য, সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুর ও তাঁর ভাতিজা মাহমুদুর রহমান সুমনের মধ্যে নির্বাচনী মাঠে শেষ পর্যন্ত ঐক্য থাকলে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ নজরুল ইসলাম বাবু এই আসনে দীর্ঘদিন সংসদ সদস্য ছিলেন। যেহেতু আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। ফলে এলাকায় তাঁর একটা প্রভাব রয়েছে। তাঁর সমর্থন যে প্রার্থী পাবেন, তিনি নির্বাচনের মাঠে বাড়তি সুবিধায় থাকবেন।
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জুয়েল আহাম্মেদ জানান, প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে এবার বিগত দিনের আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা, তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা, বিতর্কহীন ব্যক্তিত্ব এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সবদিক বিবেচনা করে দল বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদকে মনোনয়ন দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সরকারি সফর আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ গিয়াস উদ্দিন বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থী দলীয় শৃঙ্খলা ভাঙলেও তিনি মূল দলের ভোট কাটতে পারেন, যা জয়ের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন বাবুলের ভাষ্য, যেহেতু নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করতে পারছে না। তাই বিএনপি থেকে যিনি মনোনয়ন পাবেন, নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া তার জন্য সহজ এরকমটাই ধারণা সবার। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন একাধিকবার নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুর। তাঁর ভাতিজা মনোনয়নবঞ্চিত মাহমুদুর রহমান সুমনসহ অন্যারা যদি তাঁর সঙ্গে কাজ করেন, তাহলে বড় ধরনের চাপে পড়তে পারেন স্থানীয় বিএনপির প্রার্থী।
