ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঐতিহ্য

শীতের রসনায় পাতক্ষীর

শীতের রসনায় পাতক্ষীর
×

মুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী দুগ্ধজাতীয় মিষ্টান্ন পাতক্ষীর। গতকাল বৃহস্পতিবার সিরাজদীখান বাজারের একটি দোকান থেকে তোলা সমকাল

 ইমতিয়াজ বাবুল, সিরাজদীখান (মুন্সীগঞ্জ)

প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বেড়েছে শীত, সঙ্গে মুন্সীগঞ্জে বেড়েছে ঐতিহ্যবাহী দুগ্ধজাতীয় মিষ্টান্ন পাতক্ষীরের চাহিদাও। বিশেষ করে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে এখন পাতক্ষীরের চাহিদা তুঙ্গে। কারণ ঐতিহ্য অনুযায়ী, এখানকার মানুষ শীতকালে নতুন জামাইকে পিঠাপুলির সঙ্গে এই ক্ষীর খেতে দেন। তবে এখন শুধু নতুন জামাই নয়; বরং পারিবারিক রসনাবিলাসেও পাতক্ষীর জায়গা নিয়েছে সাধারণ মানুষের প্লেটে।

প্রায় দুইশ বছর ধরে পাতক্ষীর তৈরি করছে সিরাজদীখানের কয়েকটি ঘোষ পরিবার। আদি বিক্রমপুর তথা বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদীখান উপজেলার সন্তোষপাড়া গ্রামে তৈরি হচ্ছে বিশ্ববিখ্যাত এই মিষ্টান্ন। গত বছর এপ্রিলে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যেরও স্বীকৃতি পেয়েছে সিরাজদীখানের পাতক্ষীর। এটি মুন্সীগঞ্জ জেলার প্রথম জিআই পণ্য।

ঐতিহ্যবাহী এই মিষ্টান্নর রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে সন্তোষপাড়া গ্রামের পাতক্ষীরের কারিগররা আনন্দিত। তারা জানান, বংশপরম্পরায় ২০০ বছর ধরে এই পাতক্ষীর তৈরি করে আসছেন। তবে কখনও ভাবেননি, তাদের তৈরি এই মিষ্টান্ন পণ্য জিআই স্বীকৃতি পাবে। এই স্বীকৃতি তাদের জন্য গৌরবের। এখন সরকারি সহায়তা ও যথাসাধ্য প্রচার করলে পাতক্ষীরের ব্যবসা তারা আরও এগিয়ে নিতে পারবেন।
পাতক্ষীর হলো কলাপাতায় মোড়ানো সাধারণ ক্ষীরের একটি বিশেষ সংস্করণ। এই ক্ষীর তৈরি করার পর পাতায় মুড়িয়ে পরিবেশন করা হয় বলে এর এমন নামকরণ। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পিঠা পাটিসাপটার ভেতরের পুর এই পাতক্ষীর দিয়েই দেওয়া হয়।

পাতক্ষীরের ইতিহাস নিয়ে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। তবে মোগল আমলে ঢাকাবাসীর খাদ্যতালিকায় পাতক্ষীরের নাম পাওয়া যায়। সিরাজদীখান উপজেলার সন্তোষপাড়া গ্রামের পুলিনবিহারী দেব তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে প্রথম পাতক্ষীর তৈরি করেন বলে জানা যায়। এর পর থেকে তাঁর উত্তরসূরিরা এ ধারা অব্যাহত রেখেছেন। বর্তমানে সন্তোষপাড়া গ্রামের সাতটি পরিবার এ মিষ্টান্ন তৈরি করে।
সিরাজদীখান বাজারের সুনীল মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিক খোকন ঘোষ বলেন, ‘এ ব্যবসার সঙ্গে আমাদের পূর্বপুরুষ জড়িত ছিল। প্রায় ২০০ বছর ধরে আমরা পাতক্ষীরের ব্যবসা করছি। পাতক্ষীর সারাবছরই চলে; তবে শীতে চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। শীতে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ কেজি পাতক্ষীর বিক্রি করতে পারি। প্রতি কেজি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে দুধের দামের ওপর পাতক্ষীরের দাম নির্ভর করে।’

বাজারের মা ক্ষীর ভান্ডারের মালিক বিকি ঘোষ বলেন, ‘আমার দাদু প্রায় ৫০ বছর পাতক্ষীরের ব্যবসা করেছেন। এর পর আমার বাবা করেছেন। এখন আমরা করছি। প্রতিবছরের মতো এবারও শীতে এর চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। শীতে প্রতিদিন প্রায় ৪০ কেজি পাতক্ষীর বিক্রি করতে পারি।’
করিগররা জানান, পাতক্ষীর বানাতে দুধ পাতিলে ঢেলে কাঠের চামচ দিয়ে নেড়ে নেড়ে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বাল দিতে হয়। খেয়াল রাখতে হয়, যাতে দুধ পাতিলের তলায় লেগে না যায়। দুধ ঘন হয়ে এলে সেখানে সামান্য হলুদ ও পরিমাণমতো চিনি মিশিয়ে চুলা থেকে নামানো হয়। পরিমাণের অনুপাত যদি ধরা হয়, তাহলে ৩০ লিটার দুধে ৭৫০ গ্রাম চিনি ও দুই চা চামচ হলুদ বাটা মিশিয়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা আগুনে জ্বাল দেওয়া হয়। ৩০ লিটার দুধে পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ কেজি পাতক্ষীর পাওয়া যায়। সুস্বাদু পাতক্ষীরের চাহিদা বাংলাদেশ ছাড়া আরও অনেক দেশে রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইতালি, ভারত। 

সিরাজদীখানের ইউএনও রুম্পা ঘোষ বলে, পাতক্ষীর সিরাজদীখানবাসীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি অংশ, যা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। বহু প্রজন্ম ধরে সিরাজদীখানের সন্তোষপাড়া নামের একটি গ্রামে কারিগরদের নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু পাতক্ষীর। এই মিষ্টান্ন আরও প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×