ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মাটির নিচ থেকে নয়, জমি পানি পাবে বৃষ্টির ফোঁটায়

নাটোরে চালু হচ্ছে দেশের প্রথম সেন্টার পিভোট ইরিগেশন সিস্টেম সেচ প্রকল্প

মাটির নিচ থেকে নয়, জমি পানি পাবে বৃষ্টির ফোঁটায়
×

ছবি : সমকাল

লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ | ২৩:১৬

সনাতন পদ্ধতিতে মাটির নিচ থেকে পাইপের মাধ্যমে জমিতে পানি সেচ দেওয়া হয়। এর পরিবর্তে এবার আধুনিক সেন্টার পিভোট ইরিগেশন সিস্টেম (ভ্যালি ইরিগেশন সিস্টেম) মাধ্যমে পাইপের সঙ্গে যুক্ত স্প্রিংকলারের মাধ্যমে প্রায় ১২৫ একর জমিতে একসঙ্গে বৃষ্টির আকারে সেচ দেওয়া যাবে।

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন বিএডিসির পানাসি প্রকল্পের আর্থিক সহযোগিতা ও অস্ট্রিয়ার কারিগরি সহায়তায় নাটোরের লালপুরে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের দুটি খামারে বাস্তবায়ন হচ্ছে অত্যাধুনিক এ সেচ প্রকল্প।

সোমবার পরীক্ষামূলকভাবে এর বাস্তবায়ন সম্পন্ন করা হয়।

গত ২ জানুয়ারি নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ভবানীপুর ও মুলাডুলি কৃষি খামারে এ পদ্ধতি স্থাপন কাজ শুরু হয়। পাবনা-নাটোর-সিরাজগঞ্জ জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহারের মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দুটি প্রকল্পে তিন কোটি ৯৮ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে অস্ট্রিয়ার বায়ার কোম্পানির সহযোগিতায় পাইলট আকারে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়। প্রকল্পে কাজ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শেরপা পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং।

এ প্রযুক্তিতে একটি প্রকল্পে একসঙ্গে ১২৫ একর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে। বড় আকারের কৃষিজমিকে কম সময় ও কম পানি ব্যবহার করে সেচ দেওয়ার এ আধুনিক ব্যবস্থা দেশের কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।

বড়াইগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সজীব আল মারুফ সমকালকে বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচের পানি পাওয়াটা অত্যন্ত কষ্টকর। সুগার মিলের কৃষিখামারে আধুনিক সেচব্যবস্থা স্থাপন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে একসঙ্গে অনেক জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে। সনাতন পদ্ধতিতে মাঠে যে গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে কৃষকরা সেচ দেন, তাতে গাছের যতটুকু না পানির প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি পানি ব্যবহার করতে হয়। এ কারণে পানির অপচয় হয়।

তিনি বলেন, শুকনো মৌসুমে পানির লেয়ার নিচে নেমে যাওয়ায় পানি পাওয়া যায় না। অপরদিকে আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করে যদি সেচ দিতে পারি, তাহলে কম খরচে স্বল্প সময়ে একসঙ্গে অনেক জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব। এতে পানির অপচয় কম হবে। সারা বছর পানি পাওয়া যাবে। এটি কৃষিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) নাটোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন সমকালকে বলেন, দেশে প্রথম সেন্টার পিভোট ইরিগেশন সিস্টেম নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের আওতাধীন ভবানীপুর কৃষি খামারে স্থাপন করা হচ্ছে। কৃষি খামারে এক কোটি ৯৮ লাখ পাঁচ হাজার টাকা ব্যয়ে অস্ট্রিয়ার বায়ার কোম্পানির সহযোগিতায় পাইলট আকারে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন হয়েছে। এর মাধ্যমে এক সঙ্গে ৪০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া সম্ভব। পানি সাশ্রয়ী সবচেয়ে আধুনিক সেচ প্রযুক্তি এটি। কৃষক খুব অল্প খরচে সেচ সুবিধা পাবেন।

বিএডিসির পাবনা রিজিয়নালের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আহমেদ জানান, এ সেচ যন্ত্রের মাধ্যমে উঁচুনিচু জমিতে সমানভাবে পানি সরবরাহ করা যায়। ফলে ফসল উৎপাদন ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে।

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ভবানীপুর খামারের ইনচার্জ মাহাবুব-উল ইসলাম সমকালকে বলেন, এ খামারে মোট কৃষিজমি আছে ৭০১ একর। এর মধ্যে ১২৫ একর জমিতে এ প্রকল্প করা হচ্ছে। সনাতন পদ্ধতিতে প্রতি একরে দুজন করে ১২৫ একর জমিতে ২৫০ জন শ্রমিকে ৬০ থেকে ৬২ দিনে পানি সেচ দিতে হতে। বর্তমানে আধুনিক সেন্টার পিভোট ইরিগেশন সিস্টেমে মাত্র ৬০ জন অপারেটর দিয়ে পাঁচ থেকে ছয় দিনে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে।

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের জিএম (কৃষি) বাকীবিল্লাহ সমকালকে বলেন, সনাতন পদ্ধতির থেকে এ পদ্ধতিতে সেচ দেওয়া অনেক বেশি সাশ্রয়। এই প্রযুক্তিতে পানির অপচয় কম হয়, জলাবদ্ধতার আশঙ্কা থাকে না। ভ্যালি ইরিগেশন হলে প্রায় ২০ একর পতিত জমি ফসলি জমিতে রূপান্তর হবে।

তিনি জানান, বর্তমান সনাতন পদ্ধতিতে একর প্রতি ১৩ থেকে ১৪ টন ফসল পাওয়া যায়। পিভোট ইরিগেশন সিস্টেমে ২৫ থেকে ৩০ টন ফলন পাওয়া যাবে।

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ হোসেন ভূঁইয়া সমকালকে বলেন, দেশে প্রথমবারের মতো এ আধুনিক সেচ ব্যবস্থা আমাদের খামারে স্থাপন হচ্ছে, এটা শুধু মিলের জন্য নয়, এ অঞ্চলের কৃষির জন্যও বড় অর্জন ও সুসংবাদ। আশা করছি, এ সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা সময়, শ্রম ও পানি– তিনটিই সাশ্রয় করতে পারব।

আরও পড়ুন

×