ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

১২ বছরেও অপসারণ হয়নি ঝুঁকিপূর্ণ অর্ধশত ভবন

১২ বছরেও অপসারণ হয়নি ঝুঁকিপূর্ণ অর্ধশত ভবন
×

নওগাঁ শহরের ডাবপট্টি এলাকার ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে অনেক আগেই। এরপরও সেখানে বসবাস ও ব্যবসার কার্যক্রম চলছে সমকাল

 কাজী কামাল হোসেন, নওগাঁ

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:১৫ | আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ১২:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকায় রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর নওগাঁ পৌর এলাকায় প্রায় অর্ধশত ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। দীর্ঘ ১২ বছরেও সেগুলো অপসারণ বা ব্যবহার বন্ধে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এদিকে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো নওগাঁতেও একাধিকবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
গত নভেম্বরে পৌর কর্তৃপক্ষ পৌর এলাকায় ৪৩টি পুরোনো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এসব ভবনে এখনও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস ও ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বহু মানুষ।
পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত এসব ভবন নওগাঁ শহরের প্রাণকেন্দ্র বাজার এলাকা, চুড়িপট্টি, ডাবপট্টি, গাঁজাগোলা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যস্ত ব্যবসায়িক এলাকার পাশে অবস্থিত। দ্রুত সময়ের মধ্যে ভবনগুলো অপসারণের জোর দাবি জানিয়েছেন নওগাঁর সচেতন মহল।

সরেজমিন দেখা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত এসব পুরোনো ভবনের বেশির ভাগই নওগাঁ শহরের জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। এর মধ্যে রয়েছে নওগাঁ পৌরসভার মালিকানাধীন কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, জেলা মাছ বাজারের পূর্ব অংশ, জেলা সমবায় অফিসারের কার্যালয়, পুরোনো হাসপাতাল রোডে অবস্থিত সাবেক রূপালী ব্যাংক ভবন, চকএনায়েত মহল্লার একটি প্রি-ক্যাডেট স্কুল, ডাবপট্টির বদীর বিল্ডিং ও চুড়িপট্টির ভবানী ভান্ডার।

এসব ভবনের নিচে ও আশপাশে প্রতিদিন হাজারো মানুষের চলাচল রয়েছে। কোথাও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কোথাও শিক্ষা কার্যক্রম, আবার কোথাও বসবাস চলছে। স্থানীয়রা বলছেন, পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার পরও জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়েই তাদের এসব ভবনে অবস্থান করতে হচ্ছে। ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে এসব ভবনে বসবাস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

চুড়িপট্টির ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের দোকান যে ভবনে, সেটি বহু আগেই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু দোকান বন্ধ করলে পরিবার চালাব কীভাবে? প্রতিদিন ভয় নিয়েই দোকান খুলছি। হঠাৎ বড় ভূমিকম্প হলে আমরা বের হওয়ার সুযোগও পাব না।

ডাবপট্টি এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ একটি ভবনের বাসিন্দা গৃহবধূ শিউলি বেগম বলেন, এই ভবনের ওপরের তলায় আমরা পরিবার নিয়ে থাকি। মাঝেমধ্যেই দেয়ালে ফাটল দেখা যায়। ভূমিকম্প হলে শিশুদের নিয়ে কোথায় যাব–সেই চিন্তায় রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না।

পুরাতন হাসপাতাল রোডের বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, এই রাস্তা দিয়েই প্রতিদিন হাসপাতালে যাতায়াত করতে হয়। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পাশ দিয়ে হাঁটতে গেলে বুক ধড়ফড় করে। যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকার এক বাস হেলপার শাহীন আলম বলেন, এলাকাটি মানুষে ভরা থাকে। ভবনগুলো এত পুরোনো যে একটু নড়াচড়া হলেই ভেঙে পড়বে বলে মনে হয়। দুর্ঘটনা হলে বড় ধরনের প্রাণহানি ঠেকানো যাবে না।

মুক্তির মোড় এলাকার এক অভিভাবক নাসির উদ্দিন বলেন, যে ভবনে বাচ্চারা পড়াশোনা করছে, সেটাই ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায়। সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় লাগে, কিন্তু বিকল্পও নেই।

নওগাঁর স্থানীয় সামাজিক সংগঠন একুশে পরিষদের সভাপতি ডি এম আব্দুল বারী বলেন, বর্তমানে যখন-তখন ভূমিকম্প হচ্ছে। বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে নওগাঁয় যে কোনো মুহূর্তে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ঘোষিত ভবনগুলো দ্রুত অপসারণ করা জরুরি।

গণমাধ্যম কর্মী কায়েস উদ্দিন বলেন, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর নওগাঁয় ঝুঁকিপূর্ণ যেসব ভবন ও মার্কেট চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেগুলো ১২ বছরেও অপসারণ হয়নি। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হলে শহরের অপ্রশস্ত সড়ক ও ফায়ার সার্ভিসের আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে উদ্ধার কাজ ব্যাহত হবে।

এ বিষয়ে নওগাঁ পৌরসভার প্রশাসক টি এম এ মমিন বলেন, পৌর এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও মার্কেটগুলোর তালিকা প্রস্তুত করে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে। সরকারি অনুমোদন পেলেই দ্রুত সরকারি মালিকানাধীন ভবনগুলো অপসারণ করা হবে।
 

আরও পড়ুন

×