ভবঘুরে ছদ্মবেশে থাকা সম্রাট আসলে সবুজ শেখ
ফাইল ছবি
নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার ও মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ | ২২:০৮ | আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ | ১২:৪২
ভবঘুরে ছদ্মবেশে দীর্ঘদিন সাভার এলাকায় ঘুরে বেড়ানো ‘সম্রাট’-এর আসল পরিচয় উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। তদন্তে জানা গেছে, তার প্রকৃত নাম সবুজ শেখ। সে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মৌছামান্দ্রা গ্রামের পান্না শেখের ছেলে। পুলিশের কাছে ছয়টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করার পর আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন।
মঙ্গলবার সকালে ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, সবুজ শেখ নিজেকে স্থানীয় কাউন্সিলর মশিউর রহমান খান সম্রাটের নামের সঙ্গে মিল রেখে ‘সম্রাট’ পরিচয়ে চলাফেরা করত। তার দেওয়া ঠিকানা ও পারিবারিক তথ্যের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
পুলিশ জানায়, ছয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার সবুজকে গত সোমবার ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়। ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলামের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় সে। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সবুজ স্বীকার করেছে, শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন এলাকা থেকে ভবঘুরে নারীদের সে সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনে নিয়ে যেত। এর পর তাদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হতো। পরে ওই নারীরা অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক করলে বা কেউ তাদের সঙ্গে অনৈতিক কাজে জড়ালে ক্ষিপ্ত হয়ে সে তাদের হত্যা করত।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান জানান, সবুজ শেখ একজন বিকৃত রুচির ও সাইকোপ্যাথ প্রকৃতির মানুষ। সে ছয়টি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করলেও একেক সময় একেক ধরনের কারণ দেখিয়েছে। তার দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মানসিকভাবে অসুস্থ, দাবি পরিবারের
মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের মৌছামান্দ্রা গ্রামের পান্না শেখ ও মমতাজ বেগমের দ্বিতীয় সন্তান সবুজ শেখ। নিজ এলাকায় ছিনতাইকারী ও চোর হিসেবে পরিচিত হলে পরিবারের দাবি, সে মানসিকভাবে অসুস্থ।
সরেজমিন দেখা গেছে, বাড়ির চারপাশে কাপড়ে ঘেরা চৌচালা টিনের ঘর ও একটি রান্নাঘর ছাড়া তেমন কিছু নেই। স্থানীয়রা জানান, সবুজের চার বোনের মধ্যে তিনজনের বিয়ে হয়ে গেছে, একজন এখনও অবিবাহিত। তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই ঢাকায় রঙের কাজ করে, ছোট ভাই অটোরিকশা চালায়।
গ্রামবাসী অভিযোগ করেন, সবুজ ছিনতাই, অটোরিকশা ও সাইকেল চুরির মতো বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ছিল। চুরি-ছিনতাই করে সে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যেত। সর্বশেষ এক মাস আগে দুদিন বাড়িতে থেকে আবার সে চলে যায়।
সবুজের ছোট ভাই রায়হান শেখ বলেন, তার মানসিক সমস্যা ছিল এবং সে একা একা কথা বলত।
মা মমতাজ বেগম জানান, ছোটবেলা থেকে এমন ছিল না। কিন্তু কয়েক বছর ধরে আচরণে পরিবর্তন দেখা দেয়। সবুজ একা একা কথা বলে, গালাগাল করে। পরিবারের কেউ জানে না, সে কোথায় যায় বা কী করে। এক বছর আগে সে একটি মেয়েকে স্ত্রী বলে বাড়ি নিয়ে এসেছিল। তবে মেয়েটিও মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল বলে মনে হয়েছে।
সর্বশেষ জোড়া খুন
পুলিশ জানায়, সর্বশেষ ঘটনার তিন-চার দিন আগে তানিয়া ওরফে সোনিয়া নামে এক ভবঘুরে তরুণীকে সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনে নিয়ে আসে সবুজ। সেখানে ওই তরুণীর সঙ্গে আরেক ভবঘুরে যুবক অনৈতিক সম্পর্কে জড়ালে প্রথমে যুবককে দোতলায় নিয়ে হত্যা করা হয়। পরে নিচতলায় ওই তরুণীকেও হত্যা করে দুজনের মরদেহ একসঙ্গে দোতলার টয়লেটে নিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় সে।
পরে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এক ব্যক্তিকে মরদেহ কাঁধে করে নিয়ে যেতে দেখা যায়। ফুটেজের সূত্র ধরে অভিযান চালিয়ে সবুজকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা তরুণীর পরিচয়ও শনাক্ত হয়েছে। পুলিশ জানায়, নিহত তরুণীর নাম তানিয়া আক্তার। তার বাবা মৃত জসিম। মানসিক প্রতিবন্ধী তানিয়া রাজধানীর উত্তরা এলাকায় মায়ের সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকতেন। তিনি চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন এবং গত ১ জানুয়ারি থেকে নিখোঁজ ছিলেন।
দীর্ঘদিনের বিচরণ ও সন্দেহজনক আচরণ
সাভার মডেল থানার পুলিশ জানায়, সবুজ কয়েক বছর ধরে থানার সামনে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার ও পাকিজা মোড় এলাকায় ঘোরাফেরা ও রাতযাপন করত। কখনও পুলিশি পোশাক ও ক্যাপ পরে ঘুরে বেড়াত। তার আচরণ ছিল অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক।
জোড়া খুনের পর গত রোববার গ্রেপ্তার সবুজ নিজের নাম সম্রাট, বাবার নাম সালাম ও মায়ের নাম রেজিয়াসহ ব্যাংক কলোনি এলাকার বাড়ির যে ঠিকানা বলেছে, তার সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে ওই এলাকায় ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নাম মশিউর রহমান খান সম্রাট। সে ওই কাউন্সিলরের নামের সঙ্গে মিলিয়ে বলেছিল।
থানার সামনে চৌরাস্তা মোড়ের ডাব বিক্রেতা মনির জানান, সে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা চাইত এবং প্রায়ই উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করত। অনেক সময় তার হাতে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল দেখা গেলেও সব সময় একটি বাটন ফোন থাকত। কিছুদিন আগে তার গতিবিধি সন্দেহজনক মনে করে সেনাক্যাম্পের সদস্যরা তাকে আটক করেন। পরে সাভার মডেল থানার সাবেক ওসি জুয়েল মিঞা তাকে ছেড়ে দেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ফাইজুর খান জানান, প্রায় আট মাস আগে সবুজ শেখ কাশিমপুর-২ কারাগারের ৬০ নম্বর সেলের পূর্ব ভবনের নিচতলায় বন্দি ছিল। কারাগারের ভেতর সে ছিল বেপরোয়া ও সহিংস প্রকৃতির। বারবার চুরির ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়ে বিব্রত ছিল। তবে কীভাবে সে ওই কারাগার থেকে মুক্তি পেল, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
আগের হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে যোগসূত্র
পুলিশ জানায়, গত বছরের ৪ জুলাই সাভার মডেল মসজিদের সামনে এক বৃদ্ধার অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁর পরিচয় আসমা বেগম হিসেবে শনাক্ত হয়। এর পর ২০২৫ সালের আগস্ট, অক্টোবর ও ডিসেম্বরে সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার এলাকা থেকে একাধিক অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলে পুলিশ সিসিটিভি ক্যামেরা ও আলোর ব্যবস্থা জোরদার করে। সর্বশেষ ১৮ জানুয়ারি দুটি আগুনে পোড়া মরদেহ উদ্ধারের পর তদন্তে বড় অগ্রগতি আসে এবং সিরিয়াল কিলার সবুজকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন, অজ্ঞাত মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত এবং ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা– সবকিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সবুজের গ্রামের বাড়িতেও পুলিশের একটি দল পাঠানো হয়েছে।
