নিকলীতে আ.লীগ ভোটারে চোখ
সৈয়দ এহসানুল হুদা, হাসনাত কাইয়ুম,শেখ মুজিবুর রহমান, রমজান আলী
মোস্তফা কামাল, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনে শক্তিমত্তায় সমানে সমান বিএনপি আর আওয়ামী লীগ। বিগত নির্বাচনগুলোর উপজেলাভিত্তিক ফলে দেখা গেছে, জয়ের সময় তো বটেই, হারার সময়ও নিকলীতে বেশি ভোট পেয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। যদিও নিকলীর তুলনায় বাজিতপুরের ভোটার সংখ্যা বেশি। কয়েকবার নিকলীতে জেতার পরও আওয়ামী লীগ হেরে গেছে বাজিতপুরের ভোটের ব্যবধানে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এবার নির্বাচনে নেই দলটি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই দলের নিকলী উপজেলার কর্মী-সমর্থকরা নির্বাচনের ফলে ভূমিকা রাখতে পারেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। বিষয়টি অন্য দলের নেতারাও স্বীকার করেছেন।
এই আসনে এবার ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৫৩ হাজার ৫৬৬ জন। এর মধ্যে বাজিতপুরের দুই লাখ ২৫ হাজার ৫০৮ জন, আর নিকলীর ভোটার এক লাখ ২৮ হাজার ৫৮ জন। এই আসনে এবার বিএনপির প্রার্থী, দলটির বিদ্রোহী নেতা, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতির বাড়ি বাজিতপুরে। ফলে প্রার্থী ও দলের ওজনের বিবেচনায় নিকলীর কোনো প্রার্থীর নিজ উপজেলাকে ভোট ব্যাংক মনে করার সুযোগ কম। তাই বাজিতপুরের শক্তিশালী প্রার্থীদের বাড়তি নজর রয়েছে নিকলীর ভোটে।
এই আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেওয়া সৈয়দ এহসানুল হুদাকে। এর আগে দলটি প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন দিয়েছিল বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালকে। তাঁকে ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনেও মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। তিনি এবার বিদ্রোহী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, লড়ছেন হাঁস প্রতীকে। তাঁকে ইতোমধ্যে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। এই দুই নেতার বাড়িই বাজিতপুর উপজেলায়।
এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দলের জেলা কমিটির আমির মো. রমজান আলী। আর রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নিবন্ধন না থাকায় দলের সভাপতি এ এইচ এম কাইয়ুম (হাসনাত কাইয়ুম) স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে হরিণ প্রতীক পেয়েছেন। তাদেরও বাড়ি বাজিতপুর উপজেলায়। স্থানীয় বিশ্লেষকরা রমজান আলী ও হাসনাত কাইয়ুম– দুজনকেই প্রার্থী হিসেবে শক্তিশালী মনে করছেন। তাদের ধারণা, এবার বিএনপির ভোট ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন রমজান আলী ও হাসনাত কাইয়ুম। সেই হিসাবে এ আসনে লড়াই হবে চতুর্মুখী।
পাশের নিকলী উপজেলার তিন বাসিন্দা এই নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন। তারা হলেন– জাতীয় পার্টির (জাপা) মাহবুবুল আলম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. দেলাওয়ার হোসাইন ও মুসলিম লীগের মো. সাজ্জাদ হোসেন। এদের মধ্যে পুরোনো মিত্র হিসেবে জাপা প্রার্থী মাহবুবুল আলমকে আওয়ামী লীগের লোকজন কিছু ভোট দিতে পারেন– এমন ধারণা এলাকায় রয়েছে। আবার ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখায়ও কিছু ভোট যেতে পারে।
নিকলীর কুর্শা গ্রামের বাসিন্দা ও শিক্ষক আব্দুল আউয়ালের ভাষ্য, এই তিন প্রার্থীর বিজয়ী হওয়ার মতো সাংগঠনিক ও ব্যক্তিগত অবস্থান নেই। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের ভোটাররা কেন্দ্রে যাবেন কিনা, এ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁর ধারণা, বিএনপির দুজন ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে ত্রিমুখী ভোটযুদ্ধ হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া হাসনাত কাইয়ুম বাজিতপুরে ভালো ভোট পেতে পারেন।
নিকলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট বদরুল মোমেন মিঠু স্বীকার করেন, আওয়ামী লীগের ভোটাররা যদি কেন্দ্রে যান, তাহলে তারা ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মুজিবুর রহমান ইকবালের পক্ষে কাজ করছেন বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। আর এহসানুল হুদার পক্ষ নিয়েছেন অতীতে কমিটির পদ থেকে বঞ্চিতদের একটি অংশ। আর দলের নিকলী উপাজেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকও তাঁর পক্ষে কাজ করছেন। তৃণমূল পর্যায়ে মুজিবুর রহমান ইকবালের পক্ষে একটি বড় অংশ কাজ করছে। ফলে ধানের শীষের সামনে হাঁস শক্ত বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার অপেক্ষায় আছেন জামায়াতে ইসলামীর রমজান আলী। তিনি অবশ্য অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই দুই উপজেলা চষে বেড়াচ্ছেন। তাঁর ব্যক্তিগত ইমেজও ইতিবাচক বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াত কর্মীরা বলছেন, হাঁসে ধান খেয়ে যেটুকু জমিতে পড়ে থাকবে, সেটুকু দাঁড়িপাল্লায় মেপে তারা ঘরে তুলবেন।
বিএনপি ঘরানার লোকজন মনে করেন, এখানে দল হিসেবে বিএনপি এতটাই শক্তিশালী, নিজেদের মধ্যে ভোট ভাগাভাগি হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের একজনই বিজয়ী হবেন।
মন্তব্য জানতে বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদা ও হাসনাত কাইয়ুমের মোবাইল নম্বরে শনিবার সন্ধ্যায় একাধিকবার ফোন করলেও তারা ধরেননি। স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল বলেন, ‘মানুষ বিএনপির বাইরে কিছু চিন্তা করে না। আমি এত বছর ধরে এখানে নেতৃত্ব দিচ্ছি। ফলে বিএনপির ভোট আমার পক্ষেই আসবে। আমার বাড়ি বাজিতপুরে হলেও নিকলীতে ব্যাপক যোগাযোগ আছে; সমর্থনও পাচ্ছি।’ আওয়ামী লীগের ভোটার সম্পর্কে বলেন, ‘আমি আমার কৌশলে কাজ করছি। সব বিষয় বলাও যাবে না। তবে জনগণ আমাকেই বিজয়ী করবে বলে আমি শতভাগ আশাবাদী।’
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী রমজান আলী বলেছেন, ‘আমি এক বছর আগে থেকেই দুই উপজেলায় গণসংযোগ করছি। অন্যরা তো বলা যায়, ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর থেকে ভালোভাবে নেমেছেন। প্রায় ৮০ ভাগ ভোটারের সঙ্গে সরাসরি আমার যোগাযোগ হয়েছে। ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। আমাদের নিজস্ব ভোটব্যাংক আছে। এর সঙ্গে সাধারণ ভোটার আমার ভরসা। অন্য কোনো দলের একাধিক প্রার্থী আছেন কিনা, সেটা গুরুত্ব দিচ্ছি না। মানুষ এবার পরিবর্তন চায়। একটা ভালো কিছু আশা করছি।’
- বিষয় :
- আ.লীগ
