‘এইবার তিস্তার কাম না হইলে আর হবার নয়’
স্বপন চৌধুরী, রংপুর
প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:০৬ | আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘আইজক্যা কাম-কাজ ফেলাচি বাহে। রোজার বাজারঘাটের চিন্তা নাই। দেকি, কায় হামার পানিমন্ত্রী (পানিসম্পদমন্ত্রী) হয়। এদ্দিন তো দ্যাকনো, হামার দুঃখ কায়ও দ্যাকে নাই। হামাক খালি ধোঁকা দিচে। এবার ভোট নিবার জন্যে সবায় কতা দিচে। এইবার তিস্তার কাম না হইলে আর হবার নয়।’ গতকাল মঙ্গলবার টেলিভিশনে নতুন মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠান দেখার সময় এসব কথা বলেন তিস্তার চরের ষাটোর্ধ্ব মনির উদ্দিন।
নতুন মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠান উপলক্ষে শুধু মনির উদ্দিন নন; নদীপারের মোড়ে মোড়ে দোকানগুলোতে টেলিভিশনের সামনে ভিড় করেন তিস্তাপারের মানুষ। সবার মুখে উঠে আসে নতুন সরকারের আমলে তিস্তা সমস্যা সমাধানের কথা। নবগঠিত মন্ত্রিসভায় রংপুর বিভাগ থেকে তিন পূর্ণ মন্ত্রী, এক প্রতিমন্ত্রীসহ ৪ জন জায়গা পাওয়ায় তিস্তা নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন তারা।
মঙ্গলবার দুপুরে তিস্তাপারের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় লোকজন কৃষিকাজ ফেলে টেলিভিশনে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান দেখেন। এ সময় মহিপুর এলাকার কৃষি শ্রমিক হোসেন আলী বলেন, ‘এক সময়ের বড় গেরস্ত হামরা। এই তিস্তায় হামাক ফকির বানাইচে। নয়া সরকার যদি কাম না করে, হামার মরণ ছাড়া বুদ্দি (উপায়) নাই।’
গৃহবধূ লাইলী বেগম বলেন, ‘ভোটের আগোত এই তারেক রহমান তো তিস্তার কতা কইচে। হামরা তো সেই আশায় আচি।’
খরস্রোতা তিস্তার বুকে জেগেছে চর-ডুবোচর। বন্যার পানি সরে যেতেই বৃহত্তর রংপুরের পাঁচ জেলায় ৭৩৪টি চরে হচ্ছে রবিশস্যের আবাদ। কোথাও কোথাও নদীর অস্তিত্বটুকুও নেই। ভোটের আগে প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নিয়ে বালুময় নদীতে ছুটে বেড়িয়েছেন কৃষকের কাছে। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়সহ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন।
তিস্তাপারের মানুষ বলছেন, রাজনীতির টানাপোড়েনে দীর্ঘদিন আটকে আছে পানি। ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত তিস্তা যেন সবার দাবার ঘুঁটি, যার বড় প্রভাব পড়েছে উত্তর জনপদে। দেশের সবচেয়ে দারিদ্র্য ও গরিব জেলাগুলোর পাঁচটিই রয়েছে সর্বনাশা তিস্তার পাড় ঘেঁষে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যসূত্রে জানা যায়, তিস্তায় স্বাভাবিকভাবে যেখানে ন্যূনতম ১০ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা, সেখানে শুষ্ক মৌসুমে ২০০ কিউসেকও পাওয়া যাচ্ছে না।
৩০ জানুয়ারি রংপুর কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘এই (রংপুর অঞ্চল) এলাকাসহ সারা বাংলাদেশে একটি বিরাট সমস্যা হচ্ছে পানি সমস্যা। বিশেষ করে যেহেতু এলাকাটি কৃষিপ্রধান। বিএনপি সরকার গঠন করলে এই এলাকার মানুষের স্বপ্ন পূরণের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজে যথাসম্ভব দ্রুত আমরা হাত দেব।’
নদী গবেষক ও সংগঠক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ যুগের কোনো সময়েই তিস্তা নদীর সঠিক পরিচর্যা হয়নি। বরং দফায় দফায় এ নদীর সর্বনাশ করার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে যে নদী হয়ে ওঠার কথা ছিল উত্তরের জীবনরেখা, সেটা হয়ে উঠেছে অভিশাপ।
তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক ও বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা নদীবেষ্টিত লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধার মানুষ তিস্তা নদীর পানি বৈষম্যের শিকার হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রংপুরের মানুষ তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে জেগে উঠেছে। আমরা নদীপারের মানুষের অধিকার আদায় করব ইন-শা-আল্লাহ।
- বিষয় :
- তিস্তা চুক্তি
- পানিসম্পদমন্ত্রী
