পৌরসভার ময়লার ভাগাড়ে অতিষ্ঠ জনজীবন
সড়কের এক পাশে আড়াইহাজার পৌরসভার ময়লার ভাগাড়। একশ গজ দুরে রাস্তার অন্য পাশে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমকাল
সফুরউদ্দিন প্রভাত, আড়াইহাজার (নারায়ণগঞ্জ)
প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার পৌরসভার ময়লার ভাগাড়ের দুর্গন্ধে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। পরিবেশ দূষণের কারণে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ বেড়েই চলেছে। দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ গজের মধ্যে পুকুর ভরাট করে বানানো হয়েছে ওই ভাগাড়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়রা বারবার আপত্তি করলেও এটি সরানো হচ্ছে না।
পৌরসভা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চার বছর আগে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ এলাকার ময়লা-আবর্জনা ছোট বাড়ইপাড়া পুরোনো রেলওয়ের পাশের পুকুরে ফেলা শুরু করে। বর্তমানে পুকুরটি ভরাট হয়ে ময়লার স্তূপ তৈরি হয়েছে। যেখান থেকে ছড়াচ্ছে উৎকট দুর্গন্ধ। মশা-মাছির উপদ্রবসহ আশপাশের পরিবেশও দূষিত হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। পথচারীদেরও অস্বস্তিতে পড়তে হয়।
ভাগাড়টির পাশেই রয়েছে রোকনউদ্দিন মোল্লা গার্লস ডিগ্রি কলেজ এবং রোকনউদ্দিন মোল্লা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। দুর্গন্ধের কারণে ব্যাহত হচ্ছে প্রতিষ্ঠান দুটির শিক্ষার পরিবেশ। কয়েক বছর ধরে এ অবস্থা চলায় ক্ষুব্ধ শিক্ষক শিক্ষার্থী অভিভাবকরা। সমস্যাটি প্রকট হওয়া সত্ত্বেও পৌরসভা কর্তৃপক্ষ এখনও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
রোকনউদ্দিন মোল্লা গার্লস ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী উর্মি আক্তার ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসফিয়া আক্তার জুঁই বলেন, দরজা-জানালা বন্ধ করেও নাক চেপে ক্লাস করতে হয়। মনোযোগ ধরে রাখা যায় না ক্লাসে। এই ময়লার ভাগাড় এখানে চাই না আমরা। ডিগ্রি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার ও তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আফসানা আক্তার বলেন, ময়লার ভাগাড় থেকে আসা দুর্গন্ধে আমাদের অনেক সমস্যা হয়। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় টিফিনের সময়। ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধ থাকায় বাড়ি থেকে আনা টিফিন কলেজে বসে খেতে পারি না। খেতে বসলে বমি চলে আসে।
রোকনউদ্দিন মোল্লা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মৃদুল কান্তি পাল বলেন, এই ঝামেলাটি দীর্ঘদিনের। আমরা এর আগে বিষয়টি নিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষকে সঙ্গে নিয়ে পৌরসভাকে জানিয়েছি। তারা বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিলেও ভাগাড়টি সরানো হয়নি। এত কাছে ময়লার ভাগাড় থাকায় দুর্গন্ধে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে বিষয়টির সমাধান চান তিনি।
স্কুলে কর্মরত শিক্ষকরা জানান, স্কুলটিতে পড়ার মান ভালো হলেও নতুন শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে চাচ্ছে না। অভিভাবকরাও ময়লার ভাগাড়ের কারণে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পরিবেশের কথা চিন্তা করে দ্রুত সমস্যা সমাধানের দাবি জানান তারা।
কলেজের অধ্যক্ষ মো. আকতারুজ্জামান বলেন, রোকনউদ্দিন মোল্লা গার্লস ডিগ্রি কলেজ ও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে একশ গজের মধ্যেই বছরের পর বছর ধরে ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। স্থানটি রীতিমতো ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ আশপাশের এলাকাগুলোতেও। ময়লার ভাগাড় থেকে আসা তীব্র দুর্গন্ধে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পথচারীরা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। শুধু দুর্গন্ধ নয়, ময়লার ভাগাড় থেকে ছড়াচ্ছে রোগ-জীবাণুও। এতে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে বিদ্যালয়ে পড়তে আসা কোমলমতি শিশুরা। ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান।
ইদ্রিস আলী, ফজলুল হকসহ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ময়লার ভাগাড়ের পাশ দিয়েই তাদের বসতবাড়ি। তীব্র দুর্গন্ধের কারণে ঘরেও স্বস্তিতে থাকা যায় না। খাওয়াদাওয়াও ঠিকমতো করা যাচ্ছে না। ময়লা পোড়ানো এবং কুকুর যখন ময়লা নাড়ে, তখন দুর্গন্ধ আরও বেড়ে যায়। ঘর-বিছানা ভর্তি মাছি আর মাছি। চরম অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়েছে এলাকার পরিবেশ। ময়লার ভাগাড় নিয়ে পাশের কলেজ ও হাইস্কুলের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরাও ক্ষুব্ধ বলে জানান তারা।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, উন্মুক্ত স্থানে ময়লা আবর্জনা ফেলার কারণে স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে থাকে। আশপাশের লোকজনের শ্বাসকষ্ট ও পানিবাহিতসহ বিভিন্ন রোগবালাই হতে পারে। প্রাণিকুলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়ে থাকে। এতে সার্বিক সুষ্ঠু পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। এজন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শোধনাগার স্থাপন করে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলা উচিত।
আড়াইহাজার পৌরসভার প্রকৌশলী সাফায়েত সাদী জানান, চার বছর আগে পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের সিদ্ধান্তে পুরোনো রেলস্টেশনের পাশে বর্জ্য ফেলার স্থানটি নির্ধারিত হয়। ময়লা ফেলার জন্য অন্যত্র একটি স্থান নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।
আড়াইহাজারের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদ বলেন, পৌরসভার ময়লার ভাগাড়ের বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছুটি শেষে এ সপ্তাহে অফিস করবেন। উনার সঙ্গে আলাপ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ময়লার ভাগাড়টি অন্যত্র ছড়িয়ে নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর জন্য একটি সুন্দর সমাধান করে দেওয়া হবে।
- বিষয় :
- ময়লার স্তুপ
