শ্যামাসুন্দরী খাল যেন মশা উৎপাদনের কারখানা
শ্যামাসুন্দরী খাল
স্বপন চৌধুরী, রংপুর
প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৩৬ | আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৬ | ১১:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
রংপুর নগরীর ঐতিহ্যবাহী শ্যামাসুন্দরী খাল মশা উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে খনন করা খালটি এখন নগরবাসীর আশীর্বাদের পরিবর্তে অভিশাপে পরিণত হয়েছে। এর বিষাক্ত পানি পরিবেশ দূষণ করছে। বছরের পর বছর এ অবস্থা চলতে থাকলেও সংস্কারের নামে হয়েছে হরিলুট। বর্তমানে খালটির জীর্ণদশা।
সিটি করপোরেশন বলছে, মশা নিধনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সাধারণ মানুষ বলছেন মশা নিধন কার্যক্রম কোনো কাজে আসছে না। ক্রমেই বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৫৮৬ জন। এর মধ্যে দুইজন মারা গেছেন। চলতি বছরও ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে। ইতোমধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন দুইজন।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট শিরীনা আখতার জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে আক্রান্ত হয়ে দুজন চিকিৎসা নিয়েছেন। ইঞ্জিনিয়ারপাড়া এলাকার নয়ন মিয়া অভিযোগ করেন, ‘সারা বছর কোনো উদ্যোগ নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দু-একদিন ক্রাশ প্রোগ্রামের নামে ওষুধ স্প্রে করে দায়িত্ব শেষ করে। তাও নগরীর সব এলাকায় নয়। এডিস মশার প্রজননকাল আসছে। সে কারণে বড় উৎকণ্ঠায় আছি।’
ইসলামপুর এলাকার নুরুন্নাহার বেগম বলেন, সহনীয় পর্যায়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত প্রচার অভিযান নেই বললেই চলে। রংপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ জানায়, ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা নিধন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে সিটির ৩৩টি ওয়ার্ডে নয়, সাবেক পৌরসভার ১৫টি ওয়ার্ডকে (শহরকেন্দ্রিক) বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। উড়ন্ত মশা দমনে এডালটিসাইড (ম্যালাথিওন) এবং মশার লার্ভা দমনে লার্ভিসাইড (টেমিফস ৫০ ইসি) জাতীয় ওষুধ স্প্রে করা হয়। সূত্র জানায়, গত বছর উড়ন্ত মশা দমনে ৭২০০ লিটার এবং মশার লার্ভা দমনে ১২০ লিটার ওষুধ স্প্রে করা হয়েছে।
১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ শ্যামাসুন্দরী খাল নগরীর কেল্লাবন্দে ঘাঘট নদ থেকে শুরু করে ধাপ পাশারীপাড়া, কেরানীপাড়া, মুন্সিপাড়া, ইঞ্জিনিয়ারপাড়া, গোমস্তাপাড়া, সেনপাড়া, মুলাটোল, তেঁতুলতলা, নূরপুর, বৈরাগীপাড়া হয়ে মাহিগঞ্জের মরা ঘাঘটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে সংস্কার না করায় খালটি নাব্য হারিয়ে ফেলেছে। দুই ধারে অবৈধভাবে দখল হয়ে যাওয়ায় সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে খালটি। অনেক স্থানে খালের জমি বেদখল হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা সেপটিক ট্যাঙ্ক তৈরি না করে খালের মধ্যে মল-মূত্রসহ বিভিন্ন বর্জ্য ফেলছেন। ফলে খাল ভরাট হয়ে ডোবা-নালায় পরিণত হয়েছে। অনেক স্থান ভরাট হওয়ার ফলে এটি খাল কিনা বোঝার উপায় নেই। খালটির শ্রীবৃদ্ধিসহ দূষণমুক্ত করতে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও শ্যামাসুন্দরীর শ্রী ফেরানো যায়নি। খাল পরিষ্কার করতে নগরবাসী বিভিন্ন সময় আন্দোলন, সভা-সমাবেশ করলেও আশ্বাস ছাড়া কিছুই জোটেনি।
রংপুর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৩০০ বছর আগে রংপুর অঞ্চলের মহারাজা জানকী বল্লভ সেনের মা শ্রীমতি শ্যামাসুন্দরী সেন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাঁর স্মৃতি ধরে রাখা এবং ম্যালেরিয়া দূর করার জন্য দীর্ঘ এই খাল খনন করেন জানকী বল্লভ সেন। ওই সময় খালটি মূলত ঘাঘট নদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে খনন করা হয়। ১৮৯৪ সালে খননের পর থেকে খালটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ২০১২ সালে রংপুর পৌরসভা সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর ওই বছরই খালটি সংস্কার ও এর সৌন্দর্য বাড়াতে ২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। নগরীর শাপলা চত্বর এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘নির্বাচনের সময় শ্যামাসুন্দরীর অবস্থা পরিবর্তনের কথা সবাই বলেন। শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে ওঠে না।’ সেনপাড়ার শিউলি বেগম বলেন, বর্ষাকালে শ্যামাসুন্দরীর নোংরা পানি বাড়ির ভেতরে ঢুকে যায়। বর্তমানে ডেঙ্গু আতঙ্কে আছি। নদী নিয়ে কাজ করা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, শ্যামাসুন্দরী খাল হলো রংপুর মহানগরীর পানি নিষ্কাশনের একমাত্র মাধ্যম; যা এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। দিন দিন বেদখল হচ্ছে জায়গা। এর মধ্যে প্রশাসন ৭০ জনকে অবৈধ দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করলেও কাজের আর অগ্রগতি হয়নি। শ্যামাসুন্দরীকে পুনর্খনন করে পানিপ্রবাহ বাড়ানো না গেলে পুরো নগরবাসী মহাবিপদে পড়বেন, নগরজুড়ে সারা বছর সৃষ্টি হবে জলাবদ্ধতার।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সিটি করপোরেশন কাজ করছে। মশা নিধন কার্যক্রম একটি চলমান প্রক্রিয়া। শ্যামাসুন্দরী খাল দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধারসহ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
