‘দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে কীসের ইফতার, কীসের ঈদ’
আন্দোলনে নিহত সাদমানের ছবি হাতে মা কাজী শারমিন আক্তার। পাশে বাবা সমকাল
কুমিল্লা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬ | ০৮:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
রোজার মাসে বাসায় বাইরের ইফতারি আনা হতো না। আমি নিজ হাতেই নানারকমের ইফতারি তৈরি করতাম। বড় ছেলে সাদমান আর ছোট ছেলে সাফিকে নিয়ে ইফতারি করতাম। এখন সেই স্মৃতি মনে করে চোখের জল ফেলি। ছেলের রক্তমাখা কিছু পোশাক ছিল তাও পুলিশ নিয়ে গেছে। বাসায় থাকা কিছু ছবিই শেষ সম্বল। এসব দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে কীসের ইফতার, আর কীসের ঈদ। কথাগুলো বলেছেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত কলেজছাত্র হামিদুর রহমান মজুমদার সাদমানের মা কাজী শারমিন আক্তার।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার চৌয়ারা ইউনিয়নের দীঘলগাঁও গ্রামের প্রবাসী ইকবাল মজুমদারের দুই ছেলের মধ্যে সাদমান ছিল বড়। পরিবারে ঈদের প্রস্তুতির ব্যাপারে গত ১৪ মার্চ কুমিল্লা মহানগরীর দেশওয়ালিপট্টির বাসায় সাদমানের মা-বাবার সঙ্গে কথা হয় সমকাল প্রতিবেদকের। এ সময় ছেলে হত্যার বিচার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলে ঢাকার বংশালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন কলেজছাত্র সাদমান। কুমিল্লা সিসিএন পলিটেকনিকের পুরকৌশল বিভাগের ছাত্র ছিলেন তিনি। রাজধানীতে থেকে ইন্টার্নি করার সময় বন্ধুদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন।
ঈদের প্রস্তুতি নিয়ে কাজী শারমিন আক্তার বলেন, সাদমানকে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল। ছেলের বাবা প্রবাসী, অনেক বছর দুই ছেলেকে নিয়ে একাই ঈদ করেছেন। এখন ইফতার আর সাহ্রির সময় সাদমানের রক্তমাখা দেহটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মুখে ইফতার নিতে পারেন না। গভীর রাতে গেটে আওয়াজ করলে মনে হয় সাদমান এসেছে। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলে ঢাকার শাহবাগে বিজয় মিছিলে যোগ দিতে কেরানীগঞ্জ থেকে বন্ধুদের সঙ্গে বের হয় সাদমান। তখন ফোনে বলেছিল, ‘মা সুখবর আছে একটা, হাসিনা পালিয়েছে।’ বংশাল থানার সামনে গেলে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে ছাত্র-জনতা। এ সময় পুলিশের গুলি এসে লাগে সাদমানের বুকে। বন্ধুরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে বিকেল ৫টার দিকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। এই খবর শুনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। প্রবাসে থাকা সাদমানের বাবাকে ফোন করে জানান এক আত্মীয়। রাত সাড়ে ৮টার দিকে সাদমানের বন্ধুরা অ্যাম্বুলেন্সে করে কুমিল্লা নগরীর বাসায় লাশ নিয়ে আসে। শোবার ঘরে ছেলের নিথর দেহ কিছুক্ষণ রাখায় রক্তে মেঝে লাল হয়ে যায়। ওই রাতে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাশ নেওয়া হলেও ময়নাতদন্ত করতে রাজি হয়নি। পরদিন নগরীর মুন্সেফবাড়ি এবং গ্রামের বাড়িতে জানাজা শেষে লাশ দাফন করা হয়।
ছেলে হত্যার বিচার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন শারমিন আক্তার। তাঁর ভাষ্য, যে পুলিশ নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর গুলি চালিয়ে হত্যা করল, কই তাদের তো কিছুই হলো না। শেখ হাসিনার নির্দেশে গুলি চালানো হয়েছে, তারও বিচার করতে হবে। তিনি জানান, ২০২৪ সালেই রাজধানীর বংশাল থানায় হত্যা মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন। মামলার কোনো অগ্রগতি জানা নেই।
সাদমানের ছোট ভাই আশরাফুল আমিন সাফি এই বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে। সে বলে, ‘যে দিন থেকে ভাইকে কবরে দিয়ে আসি এরপর থেকে আমাদের পরিবারে আনন্দ নেই।’
প্রবাসী ইকবাল মজুমদার বলেন, ‘কোনোভাবেই সাদমানের মায়ের কান্না থামাতে পারছি না। এখন আর প্রবাসে ফিরে যেতে ইচ্ছে হয় না। ছেলেটার কী অপরাধ ছিল? নিরস্ত্র ছেলেটাকে কেন এভাবে গুলি করে মারা হলো।’
- বিষয় :
- ইফতার
