হাঁস-মুরগির জন্য আবর্জনা থেকে লার্ভা উৎপাদন
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই গবেষণা
আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬ | ০৯:০২ | আপডেট: ১৮ মার্চ ২০২৬ | ১১:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
হাজার হাজার লার্ভা আবর্জনা খেয়ে বড় হচ্ছে। সেই লার্ভা দিয়েই তৈরি করা হচ্ছে হাঁস, মুরগি ও মাছের খাদ্য। আবর্জনাকে বিশেষ এই কায়দায় ব্যবহার করে উৎপাদন হচ্ছে প্রাণিজ প্রোটিন। ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই (বিএসএফ) লার্ভার মাধ্যমে বদলে যাচ্ছে চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্রও।
প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হওয়া ৫০০ থেকে ৮০০ কেজি বর্জ্য এখন প্রোটিনসমৃদ্ধ প্রাণিখাদ্যে রূপান্তর হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব এই প্রকল্পের মাধ্যমে পচনশীল বর্জ্য থেকে উৎপাদন হচ্ছে জৈব সারও।
এটি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের একটি বিশেষ উদ্যোগ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯টি দেশের নারী শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেন। তারা এই প্রযুক্তি শিখে নিজের দেশে ফিরে এটি কাজে লাগাতে পারবেন।
চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ লিংক রোডে এইউডব্লিউর স্থায়ী ক্যাম্পাসে সম্প্রতি গিয়ে দেখা যায়, সাত ফুট লম্বা, চার ফুট চওড়া, আট ইঞ্চি উচ্চতার ২০টি পিটে চলছে লার্ভা চাষ। ওপরে টিনশেড, চারদিকে অর্ধেক দেয়াল, তার ওপর জাল দিয়ে ঘেরা ঘর। এ ঘরে ২০টি ইউনিটের প্রতিটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পচা ফল, সবজিসহ বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা। ঘরের এক কোনায় বিশেষ একটি যন্ত্রের মাধ্যমে উচ্ছিষ্ট এই উপাদানগুলোকে পিষে ফেলা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগ্রহ করা জৈব আবর্জনা এনে এই যন্ত্রেই লার্ভার খাদ্য তৈরি করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রক্রিয়ার শুরুতে বর্জ্যগুলোকে মেঝের প্রতিটি ইউনিটে ছড়িয়ে রাখা হয়। এক পর্যায়ে সেই পচা বর্জ্যের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয় ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই লার্ভা।
প্রকল্পের জন্য বিশেষ ধরনের এই মাছি (ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই) আনা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এর জীবনচক্র ৪৫ দিনের। মাছিগুলোকে মশারির মধ্যে রাখা হয়। সেই মশারির ভেতরে রাখা কাঠের টুকরো দিয়ে তেরি বান্ডিলের ফাঁকায় মাছিগোলো ডিম পাড়ে। ডিম সংগ্রহ করে হেচিং করা হয়। পাঁচ দিন পর লার্ভাগুলোকে মেঝেতে রাখা বর্জ্যের পিটে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই লার্ভা জৈব আবর্জনা খেয়ে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে ফেলে। ১৮ দিনের মধ্যে লার্ভা পরিণত হয় পিউপায়। ৯ দিন পর পিউপা রূপান্তরিত হয় ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাইয়ে।
গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান গবেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাসে সবজি, মাছ ইত্যাদির উচ্ছিষ্ট থেকে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৮০০ কেজি বর্জ্য উৎপাদন হচ্ছে। এই বর্জ্য মূল্যবান সম্পদে পরিণত করা হচ্ছে। আমরা ১০০ কেজি বর্জ্য থেকে ৩০ কেজি লার্ভা পাচ্ছি। প্রতি কেজি লার্ভা ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি করছি। প্রতি মাসে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ কেজি লার্ভা উৎপাদন হচ্ছে। সেই হিসাবে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার লার্ভা বিক্রি করছি। এসব লার্ভা ব্যবহৃত হচ্ছে হাঁস, মুরগি ও মাছের খাদ্য হিসেবে।
এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক মো. আবুল কাসেম জানান, বর্জ্য প্রথমে ক্রাশ মেশিনে দিয়ে লার্ভার খাওয়ার উপযোগী করা হয়। মাছির ডিম থেকে সৃষ্ট লার্ভা আট দিনের মধ্যে বর্জ্যগুলো খেয়ে ফেলছে। এগুলো বর্জ্য খেয়ে কিছুদিনের মধ্যে ছয় হাজার গুণ বড় হয়। এসব লার্ভা প্রোটিনসমৃদ্ধ এবং মাছ-হাঁস-মুরগির উত্তম খাবার। এ ছাড়া উন্নতমানের জৈব সারও পাচ্ছি। এর মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের ল্যান্ডফিল্ডে কমে যাচ্ছে আবর্জনার চাপ। দূর হচ্ছে দুর্গন্ধ। কমছে পরিবেশ ধ্বংসকারী মিথেন গ্যাসের নির্গমনও। বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগও রয়েছে।
এইউডব্লিউর সহকারী রেজিস্ট্রার তপু চৌধুরী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা দুই ভাগে বর্জ্য সংগ্রহ করি। প্লাস্টিক-কাগজ এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য ময়লা সংগ্রহ করে বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে জৈব সার, পোলট্রি ও মাছের খাদ্য তৈরি করা হচ্ছে। এখানে দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন হাতে-কলমে এ প্রযুক্তির জ্ঞান অর্জন করতে পারছে। উদ্যোক্তা তৈরি করতে এ আয়োজন।
তপু চৌধুরী বলেন, এখান থেকে উৎপাদন হওয়া জৈব সার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাসের ফল ও সবজি বাগানে ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া প্রাণিখাদ্য হিসেবে বিক্রি করছি লার্ভা। বর্তমানে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রামীণ এলাকায় নিষ্কাশন ব্যবস্থা, নালা এবং আকস্মিক বন্যার বাধা কমানোর বিষয়ে গবেষণা চলছে। বিএসএফের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর ইন্টার্নশিপের জন্য শিক্ষার্থীদের গাইড করা এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে সহযোগিতা করতে এ গবেষণা কার্যক্রম চলছে।
