ঈদে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে ঐতিহ্যের মেজবানি
তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামের হাজার বছরের অনেক ঐতিহ্যের অন্যতম একটি হচ্ছে মেজবান। এক সময় এ ধারা সীমাবদ্ধ ছিল বিয়ে, আকিকাসহ পারিবারিক নানা আয়োজনে। পরে সামাজিক এই আপ্যায়ন সেখান থেকে বেরিয়ে আসে, যুক্ত হয় চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের ঈদের আপ্যায়নের মূল অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে মেজবান। দিনে দিনে এটা আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
নগরীর অলিগলিতে গড়ে উঠেছে মেজবানির মাংস-ভাত বিক্রির অসংখ্য হোটেল। সাধারণত গরুর মাংস, নলা ও হাড়যুক্ত মাংস দিয়ে ডাল দিয়ে মেজবানির মাংস রান্না করা হয়। এতে ব্যবহার করা হয় নানা ধরনের মসল্লা। ফলে মেজবানের মাংস জিবে জল আনা রসনা তৃপ্তিকারী উপাদেয় খাবারে পরিণত হয়। এবারের ঈদে চট্টগ্রামে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশাপাশি বেশির ভাগ এমপি-মন্ত্রী মেজবানির মাংসে অতিথি আপ্যায়ন করান।
জানা যায়, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান। প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। বিএনপি ক্ষমতায় আসা এবং নিজের বিজয় উদযাপনে দলের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে আপ্যায়নের আয়োজন করেন। খাওয়ানো হয় মেজবানির মাংস দিয়ে। বলা হয়ে থাকে, সেই থেকে রাজনৈতিক নেতাদের আপ্যায়ন আয়োজনে মেজবানি ধারার সূচনা। এরপর থেকে প্রতিটি ঈদে মেজবানির মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করাতেন তিনি। আজ বেঁচে নেই তিনি। তবে রয়ে গেছে তাঁর চালু করা সেই ধারা।
এবারের ঈদে মেজবান দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ এমপি, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান এমপি, নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমানসহ আরও কয়েকজন এমপি ও বিএনপি নেতা। বাবার ধারাবাহিকতায় মেজবান দিয়ে খাইয়েছেন নোমানপুত্র সাঈদ আল নোমানও। গত সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
ঈদের পর দিন গত রোববার নগরীর মেহেদীবাগে বাসভবনে মেজবানির মাংস, পরাটা, জর্দা ভাত দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করান অর্থমন্ত্রী। এতে দলের নেতাকর্মী, পেশাজীবী নেতৃবৃন্দসহ বিপুল সংখ্যক লোক অংশগ্রহণ করেন। আমির খসরু তাদের সঙ্গে কুশল ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
অর্থমন্ত্রীর ব্যক্তিগত একান্ত সচিব মো. সেলিম সমকালকে বলেন, ‘স্যার প্রতি বছর ঈদে মেজবানির মাংস দিয়ে পরাটা এবং জর্দা ভাতের মাধ্যমে অতিথি আপ্যায়ন করান। এবারও তাঁর ব্যতিক্রম হয়নি।’
এ ছাড়া হেলাল উদ্দীনের চট্টেশ্বরী রোডের বাসভবন ‘ডালিয়া কুঞ্জে’ গত সোমবার ঈদ পুনর্মিলনীর আয়োজন করা হয়। বাবা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীনকে নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মেজবানির মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করানোর পাশাপাশি দলের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
প্রতিমন্ত্রী হেলাল উদ্দীন বলেন, দেড় বছরেরও বেশি সময় দেশের মানুষ কর্তৃত্ববাদী অপশাসনে নিষ্পেষিত ছিল। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এবার অনেকটা শান্তিতে, আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ঈদ উদযাপন করছেন। ভবিষ্যতে আরও সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখতে সরকার ভূমিকা রাখবে।
বাবার অনুসরণে ঈদ উপলক্ষে মেজবানির মাংস ও সাদা ভাত দিয়ে আপ্যায়ন করান নোমানপুত্র। নগরীর কাজীর দেউরী এলাকায় একটি কমিউনিটি হলে এই আয়োজন করেন তিনি। সাঈদ আল নোমান বলেন, সেই ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি, মানুষকে খাওয়াতে খুব ভালোবাসতেন বাবা। বড় কোনো অনুষ্ঠান–সেটা রাজনৈতিকই হোক কিংবা পারিবারিক, তাতে মেজবানের আয়োজন থাকত। প্রতিটি ঈদে মেজবানের আয়োজন তো থাকতই। আমিও বাবার সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে চাই।
- বিষয় :
- মেজবান
