হত্যার ৩০ ঘণ্টায়ও মামলা হয়নি
সন্দেহের তালিকায় মাদক কারবারি, প্রতিদ্বন্দ্বীরা
নিহত কনটেন্ট ক্রিয়েটর দ্বীন ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত
কসবা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ | ২০:০৫
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর দ্বীন ইসলাম (৩০) হত্যাকাণ্ডের ৩০ ঘণ্টা পরও মামলা হয়নি থানায়। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল বুধবার ওই যুবকের মরদেহের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। স্বজনেরা এই হত্যাকাণ্ডের জন্য স্থানীয় মাদক কারবারিদের দায়ী করছেন। পাশাপাশি সন্দেহ করছেন প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরকেও। পুলিশের বিরুদ্ধেও তারা মামলা নিতে তালবাহানার অভিযোগ তুলেছেন।
দ্বীন ইসলাম উপজেলার মেহারী ইউনিয়নের শিমরাইল গ্রামের সফিকুর রহমানের ছেলে। স্থানীয়ভাবে মাদক কারবারের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে গ্রামটির কুখ্যাতি রয়েছে।
দ্বীন ইসলাম ফেসবুক ও ইউটিউবে ‘তালাশ ক্রাইম দৃষ্টি’ নামের পেইজ ও চ্যানেল পরিচালনা করতেন। এতে তিনি মাদক সেবন, মাদকের কারবারসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে তৈরি ভিডিওচিত্র প্রচার করতেন।
স্বজন, এলাকাবাসী ও পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে ১৫-২০ জন দুর্বৃত্ত বাড়িতে হানা দিয়ে দ্বীন ইসলামকে ধরে নিয়ে যায়। তাঁকে বেধড়ক মারধরের পর দুপুর একটার দিকে গুরুতর অবস্থায় বুড়ি নদীর ওপারে কুমিল্লার বাঙ্গুরা থানাধীন গাঙ্গেরকুট এলাকায় ফেলে যায় তারা। এদিকে স্বজনেরা দুপুর ১২টার দিকে পুলিশের জরুরি সেবা নম্বরে (৯৯৯) কল দিয়ে অভিযোগ করেন।
কসবা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে জানতে পারে, বুড়ি নদীর ওপারে দ্বীন ইসলামের নিথর দেহ পড়ে আছে। কুমিল্লার বাঙ্গুরা থানাধীন সিদ্ধিরগঞ্জ ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা বেলা একটার দিকে তাঁকে নদী পার করে দিয়ে যায়। গুরুতর অবস্থায় স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় কসবা থানা পুলিশ দ্বীন ইসলামকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। চিকিৎসক সেখানে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
হত্যাকাণ্ডের জন্য মেহারী ইউপির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য মো. আবদুল আওয়াল ও তাঁর লোকজনকে দায়ী করেছেন স্বজন ও এলাকাবাসী। পরিবারের ভাষ্য, দ্বীন ইসলামকে প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে আসছিলো মাদক কারবারিরা।
দ্বীন ইসলামের বাবা সফিকুর রহমান ও মা পারুলী বেগম বুধবার সমকালকে বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ করছিলেন তাদের ছেলে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে একটি প্রভাবশালী চক্র। তারা পরিকল্পিতভাবে দ্বীন ইসলামকে হত্যা করেছে।
পারুলী বেগম বলেন, প্রাণভয়ে দ্বীন ইসলাম ঘরের মাচায় লুকিয়ে ছিল। ১৫-২০ জন লোক ঘরে ঢুকে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়।
সফিকুর রহমান জানিয়েছেন, ‘কয়েকদিন ধরে স্থানীয় দুজন কথিত সাংবাদিক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরের সঙ্গে দ্বীন ইসলামের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ২৩ মার্চ আমার ছেলেকে মারধর করে লক্ষীপুর গ্রামের মো. জামশেদ মিয়া মোবাইল ও মোটরসাইকেল রেখে দেয়। এমনকি জোর করে তাঁর কাছ থেকে সাদা কাগজে সই নেয়।’
জামশেদ মিয়াও এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে পরিচিত। দ্বীন ইসলাম হত্যার পর থেকে তিনি এলাকায় নেই। এ কারণে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সাবেক ইউপি সদস্য মো. আবদুল আওয়াল তাঁর বিরুদ্ধে তোলা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, দ্বীন ইসলাম হত্যায় তিনি জড়িত নন। ষড়যন্ত্র করে একটি চক্র তাঁকে জড়িয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
কসবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজনীন সুলতানা বলেন, নিহত দ্বীন ইসলামের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় ১০টি মামলা রয়েছে। হত্যার পেছনের কারণ জানতে তদন্ত চলছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কসবা উপজেলা কমিটি ও কসবা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক রুহুল আমিন টিটু বলেন, ‘দ্বীন ইসলাম যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, এর জন্য আইন-আদালত রয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বড় অপরাধীরা তাদের অপরাধ ঢেকে রাখার জন্য দ্বীন ইসলামকে হত্যা করিয়েছে।’
অভিযোগ উঠেছে, গ্রামের বিবদমান দুটি পক্ষ দ্বীন ইসলাম হত্যা মামলায় প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে চাইছে। এ কারণে মামলা নথিভুক্ত করতে দেরি করছে পুলিশ। বিষয়টি নজরে আনলে ওসি নাজনীন সুলতানা বলেন, ‘আশা করছি, এমন কিছু কেউ করতে পারবে না। আমরা ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করছি। ঘটনার নেপথ্যের কারণ গুলো খতিয়ে দেখব। পরিবার এখনও এজাহার দেয়নি।’
মঙ্গলবার রাতেই দুজনকে আটক করা হয়েছেু এমন তথ্যের বিষয়ে ওসি বলেন, ‘তাদের আসামি হিসেবে আটক করা হয়নি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আমাদের পক্ষ থেকে আমরা শতভাগ স্বচ্ছ থাকব, প্রকৃত অপরাধীদের আইনের মুখোমুখি করবো।’
- বিষয় :
- ব্রাহ্মণবাড়িয়া
- কসবা
