ঢাকা শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কর্মস্থলে ফিরতে বাড়তি ভাড়ার বিড়ম্বনা

কর্মস্থলে ফিরতে বাড়তি ভাড়ার বিড়ম্বনা
×

নান্দাইল চৌরাস্তা বাসস্ট্যান্ডে কর্মস্থলে ফেরার জন্য যাত্রীর ভিড়। অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে গন্তব্যে যেতে পারছেন না অনেকে সমকাল

নান্দাইল (ময়মনসিংহ) ও হালুয়াঘাট প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬ | ১০:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

নান্দাইল উপজেলায় ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন যাত্রীরা। জ্বালানি তেল পেতে ভোগান্তির অজুহাত দেখিয়ে বাস ও পিকআপের চালকরা তাদের কাছে অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন। এই সুযোগে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকরাও দ্বিগুণ ভাড়া দাবি করছেন।

অনেকে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দিলেও কম টাকায় যাওয়ার আশায় বসে থেকে সময় পার করছেন অনেকে। কেউ কেউ আবার বাড়িতে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার উপজেলার তিনটি বাসস্ট্যান্ড ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।

গত ২১ মার্চ ছিল ঈদুল ফিতর। দীর্ঘ সাত দিন ছুটি শেষে গত ২৩ তারিখ থেকেই বিভিন্ন পেশার মানুষ তাদের কর্মস্থলে ফেরা শুরু করেন। ঈদের খরচ শেষে কেবল যানবাহনের ভাড়া নিয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশে বাড়ি ছেড়েছেন। কিন্তু পথে তারা পড়ছেন অতিরিক্ত ভাড়ার বিড়ম্বনায়। যাদের কাছে প্রয়োজনীয় টাকা আছে, তারা অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েই কর্মস্থলে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকেই আবার দরদাম করে বনিবনা না হওয়ায় বাসস্ট্যান্ডে বসে কম ভাড়ায় যাওয়ার আশায় প্রহর গুনছেন। অনেকে প্রয়োজনীয় টাকা সঙ্গে না থাকায় বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন। এই অবস্থায় মালপত্র পরিবহনের কাজে নিয়োজিত পিকআপগুলো কিছুটা কম ভাড়ায় যাত্রী পরিবহনে নেমে পড়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে নান্দাইল চৌরাস্তা বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে যাত্রীদের ভিড়। অনেকেই যানবাহনের অপেক্ষায় ছোট ছোট ছেলেমেয়ে এবং মালপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে বা মাটিতে বসে রয়েছেন। কেউ কেউ বাড়তি ভাড়া দিয়েই গন্তব্যে রওনা দিচ্ছেন। এ সময় কেন্দুয়া উপজেলার পাহাড়পুর গ্রামের হোসাইন আহমদ জানান, ভৈরব যাওয়ার বাস ভাড়া ১০০ টাকার জায়গায় ২০০ টাকা চাইছে। ১৫০ টাকা দিতে চাইলেও রাজি হচ্ছে না। 
কিশোর সানি জানায়, খালার বাড়ি কটিয়াদীতে বেড়াতে যাবে সে। কিন্তু ৬০ টাকার বাস ভাড়া ১৫০ টাকা চাইছে। 
পোশাক কারখানার কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে থাকা ফারজানা জানান, সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়ে ইটাখলা যেতে ২৫০ টাকার ভাড়া ৪০০ টাকা করে চাইছে। ঈদে বেশি খরচ করে তাদের কাছে এখন অতিরিক্ত টাকা নেই। তাই কী করবেন, ভেবে পাচ্ছেন না। 

রোয়াইল বাড়ির হোসন মিয়া কাজের জন্য আশুগঞ্জ যেতে চাইছিলেন, কিন্তু ভাড়া বেশি চাওয়ায় বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।
সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক রুবেল মিয়া বলেন, যাত্রীদের পৌঁছে দিয়ে ফেরত আসার সময় খালি আসতে হবে, তাই ভাড়া বেশি নিচ্ছেন। 
সেখানে ভৈরব যাওয়ার উদ্দেশে দাঁড়িয়ে থাকা শ্যামল ছায়া পরিবহনের একটি বাসের চালক জানান, পাম্পে তেল নিতে গিয়ে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। তারপরও চাহিদামতো তেল পাওয়া যায় না। কখনও কখনও তেল নিতে দেরি হলে 
ট্রিপও মার যায়, ক্ষতি পুষিয়ে নিতে যাত্রীদের কাছ থেকে প্রকৃত ভাড়াটাই নিচ্ছেন তারা। কিন্তু যাত্রীরা মনে করছেন, তাদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।

নান্দাইল উপজেলা সদরে থাকা পুরোনো বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীদের ভিড়। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দেখা যায়, ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ সড়কে চলাচলকারী এমকে এবং শ্যামল ছায়া পরিবহনের বাসগুলো ময়মনসিংহ বা কিশোরগঞ্জের যাত্রী ছাড়া লোকাল কোনো যাত্রী উঠতে দিচ্ছে না। দরজায় দাঁড়ানো হেলপাররা ময়মনসিংহের যাত্রীদের ১০০ টাকা করে মিটিয়ে বাসে উঠতে দিচ্ছেন। এ সময় রেহেনা খাতুন নামে একজন জানান, তিনি রামগোপালপুর যাবেন, কিন্তু কোনো বাসেই তাঁকে নিতে চাইছে না। সিএনজিচালিত অটোরিকশা দিয়ে যেতে চাইলেও ৪০ টাকার ভাড়া ২০০ টাকা চাইছে। ১৫০ টাকা দিতে চাইলেও রাজি হচ্ছে না। 
অন্যদিকে বাসে লোকাল যাত্রী না নেওয়ার সুযোগে অটোরিকশা এবং ইজিবাইকগুলোর পোয়াবারো হয়েছে। তারা যাত্রীদের কাছ থেকে খুশিমতো ভাড়া নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন সাইফুল, মোবারকসহ বেশ কয়েকজন অপেক্ষমাণ যাত্রী। নান্দাইল-ঢাকা-হোসেনপুর সড়কে চলাচলকারী জলসিঁড়ি সার্ভিসের বাসস্ট্যান্ড আচারগাঁও গেলে কয়েকজন যাত্রী জানান, ভাড়া তো কিছু বেশি নিচ্ছেই। তবে টিকিটমাস্টার বরকত উল্লাহর দাবি, তারা আগের ভাড়াই নিচ্ছেন।
নান্দাইল হাইওয়ে থানায় যোগাযোগ করে জানা যায়, ছুটিতে রয়েছেন ওসি। দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক (এসআই) মেজবাহ জানান, তাদের ভ্রাম্যমাণ টিম প্রায়ই চৌরাস্তা বাসস্ট্যান্ডসহ অন্যান্য জায়গায় অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, অতিরিক্ত ভাড়া নিয়েছে বা চেয়েছে এটি কোনো যাত্রী স্বীকার করেন না। তাই তারাও আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারেন না। তবুও তারা বিষয়টি দেখবেন বলে জানান তিনি।

এদিকে হালুয়াঘাট থেকে ঢাকাগামী বাসেও বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিটি টিকিটে অতিরিক্ত ২০০-৩০০ টাকা ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে হালুয়াঘাট বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।
কয়েকজন যাত্রী জানান, হালুয়াঘাট থেকে ঢাকায় ঈদের আগে বাসভাড়া ছিল ২০০-৩০০ টাকা, এখন তা ৫০০-৬০০ টাকা। হালুয়াঘাটের বাসগুলো আগে (মাওনা-গাজীপুর পর্যন্ত) ১৫০ টাকা ভাড়া নিত, এখন নিচ্ছে ৫০০ টাকা। ময়মনসিংহ পর্যন্ত আগে ভাড়া ছিল ৬০-৮০ টাকা, এখন নেওয়া হচ্ছে ৩০০ টাকা।
বাস পরিবহন কর্তৃপক্ষের দাবি, হালুয়াঘাট থেকে ঢাকা পর্যন্ত বিআরটিএ বাস ভাড়া ৪৫৮ টাকা। সারাবছর যাত্রী সংকট থাকায় ২৫০-৩০০ টাকা নিয়ে থাকেন, তবে ঈদ উপলক্ষে ৫০ টাকা বেশি নিচ্ছেন।
বিকেলে পৌর শহরের বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, অনেকে টিকিট না পেয়ে বসে আছেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেন ময়মনসিংহ, ভালুকার কোনো যাত্রী তোলা হচ্ছে না।
ঢাকায় এক কারখানায় কাজ করা পোশাক শ্রমিক আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে স্বজনের সঙ্গে ঈদ করতে বাড়ি আসছিলাম। আজ (বৃহস্পতিবার) চলে যেতে হচ্ছে, দুপুর থেকে বসে আছি ভাড়া আগের চেয়ে ২০০ টাকা বেশি।’

ময়মনসিংহে যাবেন বলে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন রিনা বেগম। তিনি জানান, দুই ঘণ্টা ধরে বসে আছেন, কিন্তু কোনো বাসেই ময়মনসিংহের যাত্রী তোলা হচ্ছে না।
ঢাকায় বেসরকারি একটি অফিসে কর্মরত নিয়াজ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই ঈদযাত্রায় যেন ভোগান্তি না থাকে। ২০০ টাকার ভাড়াও এখন 
৫০০ নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
শ্যামলী বাংলা পরিবহনের টিকিট কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা শুভ জানান, তাদের নির্ধারিত ভাড়া ৪৫৮ টাকা। ঈদ উপলক্ষে ৫০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। কেউ যদি অভিযোগ করে থাকেন, তাহলে তা মিথ্যা। ৫০০ টাকার বেশি নিচ্ছেন না তারা।
জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাত বলেন, ‘বাড়তি ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা প্রতিনিয়ত মনিটরিং করছি।’
 

আরও পড়ুন

×