স্রোতে তলিয়ে যাচ্ছিলেন পাঁচজন, ঝাঁপ দিয়ে দুজনকে উদ্ধার করে মারা গেলেন তরুণ
শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে নামার আগে সেলফিতে নারী-শিশুসহ ছয়জন
শিবপুর (নরসিংদী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:২৪
নরসিংদীর শিবপুরে শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে নেমে স্রোতে তলিয়ে যাচ্ছিলেন নারী, শিশুসহ পাঁচজন। তাদের বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দেন স্থানীয় তরুণ সৌরভ মিয়া। শিশুসহ দুজনকে উদ্ধার করে পাড়ে তোলার পর অন্য একজনকে বাঁচাতে আবার নদীতে নামেন তিনি। এ সময় তীব্র স্রোতে তলিয়ে যান সৌরভ।
শুক্রবার বিকেলে উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের লাখপুর গ্রামের চর লাখপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশে শীতলক্ষ্যা নদীতে এ ঘটনা ঘটে। আজ শনিবার সকাল থেকে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে সৌরভসহ তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন মো. শান্ত (২৪)। তিনি টাঙ্গাইল সদর উপজেলার জুয়েলের ছেলে এবং তিতুমীর সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক (সম্মান) শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি তাহমিদ আইটি ডিজিটালে খণ্ডকালীন চাকরি করতেন।
লাশ উদ্ধার হওয়া অন্য দুজন হলেন- গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ভঙ্গাল এলাকার সৌদিপ্রবাসী ওবায়দুল্লাহ (৩৮) এবং কাপাসিয়ার ফুলবাড়িয়া গ্রামের ইসমাইলের স্ত্রী শান্তা আক্তার (২৪)। সৌরভ মিয়া শিবপুরের লাখপুর গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে।
পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সৌদিপ্রবাসী ওবায়দুল্লাহ স্ত্রী শাহীনুর আক্তার ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শ্বশুরবাড়ি চর লাখপুরে বেড়াতে এসেছিলেন। গতকাল বিকেল তিনটার দিকে পরিবারের ছয় সদস্য শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে নামেন। গোসলের একপর্যায়ে শান্তা আক্তার নদীতে তলিয়ে যেতে থাকেন। তাকে টেনে ধরতে গিয়ে তার বোন শাহীনুর আক্তারও শিশুসন্তানসহ হাবুডুবু খেতে থাকেন। এ সময় ওবায়দুল্লাহ ও শান্ত তাদের উদ্ধারে এগিয়ে গেলে তারাও পানিতে তলিয়ে যেতে থাকেন।
বিষয়টি দেখে তাদের উদ্ধারে নদীতে ঝাঁপ দেন সৌরভ। তিনি শিশুসন্তানসহ শাহীনুরকে পাড়ে তুলে আনেন। এরপর আরেকজনকে উদ্ধারের জন্য আবার নদীতে নামলে তীব্র স্রোতে তিনিও তলিয়ে যান। স্থানীয় লোকজন নদীতে নেমে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করেও কাউকে খুঁজে পাননি।
খবর পেয়ে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে শিবপুর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। তবে নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে সন্ধ্যা পর্যন্ত অভিযান চালিয়েও নিখোঁজ চারজনের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
আজ শনিবার সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে ভৈরব থেকে আসা ডুবুরি দলকে সঙ্গে নিয়ে আবার উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। সকাল ১০টার দিকে ওবায়দুল্লাহ ও সৌরভের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে বেলা ১২টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণে সাওরাইদ এলাকায় নদীতে শান্তা আক্তারের লাশ ভাসতে দেখা যায়। পরে তার লাশও উদ্ধার করা হয়।
বেঁচে যাওয়া শাহীনুর আক্তার বলেন, ‘শান্তা তলিয়ে যাচ্ছিল দেখে টেনে ধরে রাখতে চেয়েছিলাম। পরে নিজেও তলিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার স্বামী ও ভাগনে আমাদের বাঁচাতে গিয়ে ডুবে যায়। সৌরভ নামের ছেলেটি ঝাঁপ দিয়ে বাচ্চাসহ আমাকে পাড়ে তোলে। আমাদের বাঁচানোর পর অন্যদের বাঁচাতে আবার নদীতে নামে সে। পরে সেও ডুবে যায়।’
শিবপুর ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা আবুল কাশেম বলেন, গতকাল নদীতে তীব্র স্রোত থাকায় ভালোভাবে উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি। আজ ডুবুরি দল নিয়ে আবার অভিযান শুরু করা হয়। এ পর্যন্ত তিনজনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। নিখোঁজ শান্তকে উদ্ধারে আগামীকাল রোববার সকালে আবার অভিযান চালানো হবে।
সৌরভের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অন্যদের বাঁচাতে গিয়ে সৌরভ নিজেই প্রাণ হারিয়েছেন। তার এই চেষ্টা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে।
শাহীনুরের বাবা সুকচান শেখ ও তার স্ত্রী হাসিনা বেগম বলেন, দাওয়াত খেতে মেয়ে, জামাই ও নাতি বেড়াতে এসেছিলেন। শুক্রবার বাড়ির পাশে নদীতে গোসল করতে গিয়ে তারা ডুবে যান। শাহীনুরের স্বামী ওবায়দুল্লাহ সৌদি আরব থেকে পাঁচ মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। দুই মাস পর তার আবার সৌদি আরবে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল।
দুলালপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. নাসির উদ্দীন বলেন, ঘটনাটি মর্মান্তিক। বেড়াতে এসে নদীতে গোসল করতে গিয়ে তারা মারা গেছেন।
শিবপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ কোহিনূর মিয়া বলেন, নিখোঁজ চারজনের মধ্যে তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। একজন এখনো নিখোঁজ। তাকে উদ্ধারে আগামীকাল আবার অভিযান চালানো হবে। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
- বিষয় :
- নরসিংদী
- পানিতে ডুবে মৃত্যু
- উদ্ধার