শান্তি স্থাপনে ব্রিকস সদস্যদের সঙ্গে একত্রে কাজ করবে চীন: শি জিনপিং
ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (ছবি-এএফপি)
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:০৮ | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:২৬
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাধারণ স্বার্থ রক্ষা করে না। শান্তি স্থাপনে চীন ব্রিকসের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে একত্রে কাজ করবে।’ ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত নিয়ে এক মন্তব্যে এ কথা বলেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্রিকস জোটের দেশগুলোকে ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোকে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরোধিতা করারও আহ্বান শি জিনপিং।
আজ শনিবার ব্রিকস সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, পশ্চিম এশিয়া ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জনে যথাযথ ভূমিকা পালনের জন্য ব্রিকস-এর অন্য সদস্যদের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক চীন। এই যুদ্ধ ওই অঞ্চলজুড়ে জনগণের গুরুতর ক্ষয়ক্ষতির কারণ হচ্ছে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাধারণ স্বার্থের পক্ষে না।
তিনি বলেন, ব্রিকস দেশগুলোর উচিত সব ধরনের ‘সুরক্ষাবাদ’ প্রত্যাখ্যান করা। আমাদের উচিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বহুমুখী বাণিজ্য ব্যবস্থাকে সমর্থন করা এবং সব ধরনের সুরক্ষাবাদ প্রত্যাখ্যান করা। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্কের বিরোধিতা করারও আহ্বান জানান তিনি।
শি জিনপিং ব্রিকস জোটকে ‘গ্লোবাল সাউথের’ নেতৃত্বস্থানীয় এবং উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর আত্মনির্ভরশীলতার মডেল হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, এই জোটের উচিত উদ্ভাবন-ভিত্তিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করা।
ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লিতে নজিরবিহীন ও জটিল নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। বিদেশি নেতাদের নিজস্ব নিরাপত্তা দলের সঙ্গে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হচ্ছে। সিসিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শি জিনপিং জানান যে চীন আগামী বছর ব্রিকসের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং ১৯তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করবে।
এদিকে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন শুরুর আগে জোটের সদস্যদেশগুলো একটি যৌথ ঘোষণার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। এতে কোনো দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা জানানোর কথা বলা হয়। সংঘাত নিরসনে ‘সংলাপ ও কূটনীতিকে’ সামনে রাখার কথাও বলে জোটের সদস্যরা।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যৌথ ঘোষণায় কী ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে ব্রিকসের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। বিশেষ করে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় ঐকমত্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। এবারের সম্মেলনের আগে ব্রিকসের কূটনীতিকেরা কয়েক দিন ধরে যৌথ ঘোষণার ভাষা নিয়ে আলোচনা করেন। শেষ পর্যন্ত এমন একটি ভাষায় ঐকমত্য হয়েছে, যা ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত-দুই দেশই মেনে নিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
চলমান যুদ্ধের কারণে আগস্টে ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। যুদ্ধের সময় আমিরাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এর আগে মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ইরান ও আমিরাতের মতপার্থক্যের কারণে কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে এবার সদস্যদেশগুলোকে একটি অভিন্ন অবস্থানে আনতে পারাকে ভারতের কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারত এবার ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে। দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের সংকট মোকাবিলায় ‘সংলাপ ও কূটনীতিকে’ সমাধানের পথ হিসেবে তুলে ধরছে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সরবরাহ বহনকারী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ওপরও জোর দিচ্ছে নয়াদিল্লি।
বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চাইছে ব্রিকস। জোটের কয়েকটি দেশ বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মতো প্রতিষ্ঠানে সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাব বেশি। এবারের সম্মেলনে বাণিজ্য সহযোগিতা বাড়ানো, বাণিজ্যিক বাধা কমানো এবং ব্যবসার সুযোগ সম্প্রসারণে জোর দিচ্ছে ভারত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইসরায়েল, ইরান ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ভারসাম্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
নয়াদিল্লির এবারের সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানসহ জোটের নেতারা অংশ নিচ্ছেন।
ব্রিকসের সদস্যদেশগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা বিশ্বের ৪০ শতাংশের বেশি। বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও তাদের অংশ প্রায় এক-চতুর্থাংশ। খবর- রয়টার্স