অন্ধকার সুড়ঙ্গে ৯ দিন, শুধু পাথরের চুইয়ে পড়া পানি খেয়ে বেঁচে ছিলেন সঞ্জয়
ছবি: রয়টার্স
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:২৩
নেপালে ভয়াবহ বন্যায় জল ও কাদায় ডুবে যাওয়া একটি সুড়ঙ্গে টানা নয় দিন আটকে ছিলেন সঞ্জয় সাহা। খাবার ছিল না। চারপাশে ছিল অন্ধকার, ভাঙা যন্ত্রপাতি ও ধ্বংসস্তূপ। বেঁচে থাকতে তিনি পাহাড়ের শিলা চুইয়ে পড়া পানি ও বন্যার পানি পান করেছেন। উদ্ধার হওয়ার পর শুক্রবার হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ৩০ বছর বয়সী এই নেপালি।
রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সঞ্জয় বলেন, সুড়ঙ্গের ভেতরে ধ্বংসস্তূপের আঘাতে চোখে চোট লাগার ভয়েই দিনের পর দিন চোখ বন্ধ করে রাখতেন। এত বেশি সময় চোখ বন্ধ রাখার পর একসময় চোখ মেলাও কঠিন হয়ে গিয়েছিল।
সঞ্জয় সাহা নেপালের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির আওতাধীন আপার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে তিন বছরের বেশি সময় ধরে যন্ত্রকৌশল বিভাগের ফোরম্যান হিসেবে কাজ করছিলেন। জলবিদ্যুৎকেন্দ্রটির বহুতল পাওয়ারহাউসটি পাহাড়ের ভেতরে নির্মিত।
গত আগস্টের শেষ দিকে হিমবাহ ধসে নেপালের বিভিন্ন উপত্যকায় ভয়াবহ বন্যা ও ধসের সৃষ্টি হয়। এতে নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে অন্তত ১ হাজার ৩০০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৫ হাজার ৩০০ জনের বেশি।
‘হাল ছেড়ে দেওয়ার কী দরকার’
সঞ্জয় জানান, হতাশা তাকে গ্রাস করতে চাইলে তিনি ভগবান কৃষ্ণের ভক্তদের মধ্যে প্রচলিত মহামন্ত্র জপ করতেন—‘হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, হরে হরে...’। এতে তার মনে একধরনের আধ্যাত্মিক অনুভূতি তৈরি হতো এবং ভয় অনেকটা কেটে যেত।
সঞ্জয় বলেন, ‘আমার যদি মরতেই হয়, তাহলে এত তাড়াতাড়ি হাল ছেড়ে দেওয়ার কী দরকার? তাই আমি ঈশ্বরের নাম জপ করতে থাকি।’
তিনি জানান, সুড়ঙ্গের ভেতর খাবার ছিল না। পাহাড়ের শিলা চুইয়ে পড়া পানি ও বন্যার পানি পান করেই বেঁচে ছিলেন।
সুড়ঙ্গের ষষ্ঠ তলার একটি অংশে এমন একটি জায়গা ছিল, যেখান থেকে নিচের দিকে তাকানো যেত। সেখান থেকে তিনি চিৎকার করে জানতে চাইতেন, আর কেউ বেঁচে আছেন কিনা। কিন্তু কোনো সাড়া পাননি।
সঞ্জয় বলেন, শুরুতে তার বিশ্বাস ছিল উদ্ধারকারী দল আসবে। দিন যত গড়িয়েছে, সেই বিশ্বাসও ধরে রেখেছিলেন। বাইরে তার পরিবার অপেক্ষা করছে- এই চিন্তাই তাকে শক্তি দিয়েছে। তার দুই বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে।
সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেছিলেন
সুড়ঙ্গে আটকে থাকার সময়ের হিসাব একেবারেই হারিয়ে ফেলেছিলেন সঞ্জয়। তার ধারণা ছিল, হয়তো দুই বা তিন দিন কেটেছে। কিন্তু উদ্ধার হওয়ার পর জানতে পারেন, তিনি প্রায় ১০ দিন সেখানে ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছিল আমি যেন অন্য একটি জগতে বাস করছি।’
বন্যার পানিতে সুড়ঙ্গটি কাদা ও ধ্বংসাবশেষে পুরোপুরি বদলে যায়। আগে যে সুড়ঙ্গের প্রতিটি অংশ তার পরিচিত ছিল, পরে সেখানে চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়ে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা যন্ত্রপাতি ও বাক্স, ভেঙে পড়া দেয়াল এবং জমে থাকা ধ্বংসাবশেষে তৈরি হয় গর্ত ও উঁচু ঢিবি।
সঞ্জয় জানান, প্রথম দিকে তিনি সুড়ঙ্গের ভেতরে চলাচলের চেষ্টা করেছিলেন। পরে বুঝতে পারেন, অন্য জায়গায় গেলে আরও বিপজ্জনকভাবে আটকে পড়তে পারেন। তাই তুলনামূলক নিরাপদ মনে হওয়া একটি জায়গায় ফিরে গিয়ে সেখানেই অবস্থান করেন। শেষ পর্যন্ত উদ্ধারকারীরা তাকে সেখান থেকেই উদ্ধার করেন।
উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগে বুঝতে পেরেছিলেন
উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগে বাইরে থেকে বিভিন্ন শব্দ শুনতে পান সঞ্জয়। খননযন্ত্রের শব্দ, মইয়ের ধাতব শব্দ- এসব শুনে তার মনে আশা জাগে। তিনি বলেন, উদ্ধার হওয়ার প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা আগে বাইরের মানুষের কাজ করার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলেন। তখন তার মনে হয়েছিল, উদ্ধারকারী দল তার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
সঞ্জয়ের সঙ্গে একই সুড়ঙ্গে আটকা পড়েছিলেন ৪৫ বছর বয়সী কবির মহার্জন। বন্যার সময় দুজনই সুড়ঙ্গের ওপরের দিকে উঠেছিলেন। তারা মনে করেছিলেন, বড় ধরনের বন্যা হলেও এত ওপরে পানি পৌঁছাবে না।
কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই নিচ থেকে পানি ঢুকতে শুরু করে। প্রথমে বাতাসের চাপ অনুভূত হয়, পরে পানি ঢুকে পড়ে। সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে দুজন আলাদা হয়ে যান। সঞ্জয়ের মোবাইল ফোনও পানিতে ভেসে যায়। কবির কোথায় গেছেন, তিনি জানেন না।
কবির পরে উদ্ধার হন এবং সঞ্জয়ের চেয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
সঞ্জয় জানান, তিনি নিজে বেঁচে ফিরলেও সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়ে আসার পর কয়েকজনকে বন্যার পানি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ওই ব্যক্তিদের তিনি সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘এটাই সবচেয়ে কষ্টের বিষয়।’
সূত্র: রয়টার্স
- বিষয় :
- নেপাল
- বন্যা
- সাক্ষাৎকার
- উদ্ধার