ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পাঁচশ বছরের ঈদ মেলায় কোটি টাকার বাণিজ্য

পাঁচশ বছরের ঈদ মেলায় কোটি টাকার বাণিজ্য
×

বাঘার শাহদৌলা (র.)-এর মাজারসংলগ্ন প্রাঙ্গণে ঈদ মেলায় চলছে কেনাবেচা সমকাল

বাঘা (রাজশাহী) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬ | ১০:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহীর বাঘার ঐতিহাসিক শাহদৌলা (র.)-এর মাজারসংলগ্ন বিশাল প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ঈদের মেলা। হজরত শাহ মোয়াজ্জেম ওরফে শাহদৌলা (র.)-এর ৪৯৭তম এবং তাঁর পুত্র হজরত আবদুল হামিদ দানিশমন্দ (র.)-এর ৩৯৮তম ওফাত দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই মেলা এখন কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং উত্তরবঙ্গের এক বিশাল সর্বজনীন মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, ছোট-বড় পাঁচ শতাধিক দোকান হরেক রকমের পণ্য নিয়ে সাজানো। মিষ্টি, কসমেটিকস, খেলনা, মৃৎশিল্প, হস্তজাত পণ্য থেকে শুরু করে বিশাল আসবাবের দোকান–কী নেই এখানে! শিশুদের জন্য রাইডস আর খেলনার দোকানের সামনে ভিড় সবচেয়ে বেশি। নারীর পছন্দের তালিকায় রয়েছে গহনা, কসমেটিকস এবং লোহা-বাঁশের তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী। মেলার প্রাণচাঞ্চল্য দেখে মুগ্ধ নাট্যকার শিমুল সরকার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আগে পাঁচ মাইল পথ হেঁটে বাঘার মেলায় আসাই ছিল ঈদের মূল আনন্দ।’
স্মৃতি ও বর্তমানের মেলবন্ধন মেলার বয়স বাড়লেও বদলায়নি কিছু মানুষের আবেগ। ৯০ বছর বয়সী জমসেদ আলী দীর্ঘ ৭৬ বছর ধরে ভ্রাম্যমাণ হোটেল নিয়ে এই মেলায় আসছেন। তিনি জানান, আগে মানুষ পাটিতে বসত, এখন চেয়ার-টেবিল লাগে। কুষ্টিয়া থেকে আসা নতিজা বেগম (৪০) বিয়ের পর থেকেই স্বামীর সঙ্গে বাঁশ ও বেতের সামগ্রী নিয়ে এখানে আসছেন। আবার কেউ কেউ আসছেন তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে। বগুড়ার ওসমান আলী (৭৫) ৩৫ বছর ধরে পোড়ামাটি ও বাঁশের তৈরি টমটম গাড়ি বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, ‘ষাট বা সত্তরের দশকে একটি খেলনা এক টাকার কমে বিক্রি করতাম, এখন সময় বদলেছে।’
মেলা ঘিরে এবার কয়েক কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। খুলনার কসমেটিকস ব্যবসায়ী মেরাজ গাজী জানান, গত কয়েক দিনে তাঁর সাড়ে ৪ লাখ টাকার বেশি বেচাকেনা হয়েছে। পাইকারি খেলনা বিক্রেতা সহিদুল ইসলাম বিক্রি করেছেন সাড়ে ৪ লাখ টাকার পণ্য। এছাড়া মিষ্টির দোকানদার সাইফুল ইসলাম ৩ লাখ এবং কুটির শিল্পের মালিক পরিতোষ মণ্ডল সাড়ে ৩ লাখ টাকার কেনাবেচা করেছেন। তবে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, আধুনিক প্লাস্টিক পণ্যের ভিড়ে মাটির খেলনা ও বাঁশের সামগ্রীর চাহিদা আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
শাহদৌলা সরকারি কলেজের প্রভাষক আবদুল হানিফ জানান, আম ও রেশমসমৃদ্ধ বাঘার এই মেলা এখন গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করছে। ওয়াকফ এস্টেটের মোতওয়াল্লি খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, এবার ১২ লাখ ৭০ হাজার টাকায় মাঠ ইজারা দেওয়া হয়েছে।  
মেলা কমিটির সভাপতি শফিকুল ইসলাম জানান, ঈদুল ফিতরের দিন মেলা শুরু হয়েছে। মেলার অনুমতি আছে ১৪ দিন।  তবে সাত দিন আগে থেকে বিভিন্ন দোকান বসেছে। সেই দিন থেকে কেনাবেচা শুরু হয়। আসবাব, পোশাক, কসমেটিকস, জুতা-স্যান্ডেল থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের পণ্য বিক্রি হয়। এ ছাড়া শিশুদের জন্য রাইডসসহ বিভিন্ন আয়োজন রয়েছে। সেই হিসাবে প্রায় ১০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন  হতে পারে। মেলা ঘিরে বাঘার অর্থনীতি চাঙ্গা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সার্বক্ষণিক মোতায়েন রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেরাজুল হক। উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও মাজার পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি শাম্মী আক্তার সমকালকে জানান, ইজারা থেকে প্রাপ্ত অর্থ মাজার ও মসজিদের উন্নয়ন কাজে ব্যয় করা হয়।
১৪ দিনব্যাপী এই মেলা বাঘার মানুষের চিত্ত ও অর্থনীতি দুই-ই বদলে দিয়েছে। ঐতিহ্যের এই ধারা যেন বজায় থাকে, এমনটাই প্রত্যাশা মেলায় আসা হাজারো দর্শনার্থীর।
 

আরও পড়ুন

×