লিবিয়ায় জিম্মিদশা থেকে মুক্ত সুজনই এখন চক্রের হোতা
সুমন খান, হাতীবান্ধা (লালমনিরহাট)
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইতালি যাওয়ার প্রলোভনে মানব পাচারকারীর খপ্পরে পড়ে ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহীর চার ব্যক্তি লিবিয়ায় চরম বিপদে পড়েছেন। একটি চক্র ওই চারজনকে জিম্মি করে চালাচ্ছে নির্যাতন এবং দেশে থাকা পরিবারের লোকজনের কাছে দফায় দফায় টাকা দাবি করছে। এই চক্রের হোতা লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার মো. সুজন নামের এক ব্যক্তি বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি নিজেও এক সময় লিবিয়া গিয়ে জিম্মি হন। পরে মুক্ত হয়ে এই বাণিজ্যে নামেন।
সম্প্রতি পরিবারগুলো জিম্মিদশা থেকে তাদের উদ্ধারে ব্যবস্থা নিতে সুজনের গ্রামের বাড়িতে এসে মারধরের শিকার হয়ে থানায় অভিযোগ করেন। শুধু ওই পরিবারগুলোই নয়, এই চক্রের খপ্পরে পড়ে অনেক পরিবার কোটি কোটি টাকা খুইয়ে এখন দিশেহারা।
জানা গেছে, হাতীবান্ধা উপজেলার সিংগীমারী ইউনিয়নের ধুবনী (হাজীর মোড়) গ্রামের আব্দুল মজিদের ছেলে সুজন। তিনি এক সময় লিবিয়ায় ছিলেন। পরে দেশে এসে ‘আদম পাচার’ কারবারে জড়িয়ে পড়েন। বর্তমানে ঢাকায় থেকে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে ‘জিম্মি কারবার’ চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, কয়েক মাস ধরে খুলনার রূপসা উপজেলার রামনগর গ্রামের ইসরাফিল মোল্লার ছেলে রাকিব হাসান (১৯), চর রূপসা গ্রামের রোকন হাওলাদারের ছেলে মুসফিকুর রহমান ইমন (২০), ঢাকার সাভারের বাবুল আহমেদের ছেলে পলাশ হোসেন (২৮) এবং রাজশাহী সিটির চন্দ্রিমা থানার হাফিজুল খাঁ (৪৫) ইতালি যাওয়ার স্বপ্নে কয়েক মাস ধরে লিবিয়ায় জিম্মি অবস্থায় রয়েছেন।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর থানায় দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়, মাদারীপুর সদর থানার দক্ষিণ পাড়া গ্রামের হালিম চৌকিদারের ছেলে মো. জিসানের সঙ্গে পাচার হওয়া চারজনের পরিচয় হয়। পরে ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সুজনসহ তিনি তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নেন। কিন্তু ওই চারজনকে ইতালি না পাঠিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে চক্রের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে জিম্মি করে রেখেছেন।
জিম্মিদশায় থাকাদের পরিবারের অভিযোগ, লিবিয়া থেকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা বলে তাদের জিম্মি করে অমানবিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে মুক্তিপণের দাবি করে আসছে। কেউ কেউ স্বজনদের উদ্ধারে সুজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকাও দিয়েছে। কিন্তু গত ছয় মাসেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। নিরুপায় হয়ে পরিবারগুলোর সদস্যরা গত ২৮ মার্চ তাঁর বাড়িতে গেলে সুজন ও তাঁর সহযোগীরা তাদের ওপর হামলা করে।
ভুক্তভোগী রাকিবের মা শামসুন্নাহার লাকী সমকালকে বলেন, ‘আমার ছেলেকে সুজনের মাধ্যমে বিদেশ পাঠাই। কিন্তু সে ও তার সহযোগীরা আমার ছেলেকে জিম্মি করে অমানবিক নির্যাতনসহ মুক্তিপণ দাবি করে। মুক্তিপণের টাকা দিলেও এখন পর্যন্ত আমার ছেলে উদ্ধার হয়নি।’
পিয়ারী বেগম অভিযোগ করেন, ‘জিসানের মাধ্যমে সুজনের সঙ্গে আমার স্বামীর পরিচয় হয়। পরে সুজন বছর খানেক আগে নগদ আট লাখ ও পাঁচ লাখ টাকার একটি চেক নিয়ে আমার স্বামীকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে লিবিয়া পাঠিয়ে সেখানে জিম্মি করে।
হাতীবান্ধা থানার ওসি রমজান আলী বলেন, ‘সুজনের বিরুদ্ধে প্রতারণার চারটি অভিযোগ পেয়েছি। তদন্তের পাশাপাশি অভিযুক্তদের ধরতে অভিযান চলছে।’
অভিযুক্ত সুজনের সঙ্গে কথা বলতে কয়েকদিন তাঁর বাড়িতে গেলেও পাওয়া যায়নি। পরিবারের লোকজন জানান, তিনি ঢাকায় থাকেন। পরে মোবাইল ফোনে সুজন বলেন, ‘আমিসহ মফিজুলের মাধ্যমে ওই চারজন লিবিয়া গেছে। তবে টাকা লেনদেন করেছে মফিজুল। তারা লিবিয়ায় ভালো আছে, হারিয়ে যায়নি। তাদের উদ্ধার করার চেষ্টা করছি।’
সুজন যেভাবে জিম্মিচক্রে
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরিবারের সচ্ছলতার আশায় বছর দুয়েক আগে ভিটেমাটি বিক্রি করে লিবিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন সুজন। সেখান থেকে তাঁর ইতালি বা ইউরোপের কোনো দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এক সময় তিনি নিজেও আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়েন। পরে মুক্তি পেয়ে অন্য কোনো দেশে না গিয়ে সেই চক্রেরই সদস্য হয়ে ঢাকায় ফিরে ওই চক্রের হয়ে কাজ শুরু করে কোটিপতি বনে গেছেন।
হাতীবান্ধা উপজেলার ধুবনী গ্রামের বাসিন্দা সামিউল ইসলাম বলেন, ‘সুজন এক সময় লিবিয়ায় গিয়ে দালাল চক্রের হাতে প্রতারণার শিকার হয়। সেখান থেকে কয়েক মাস পর সরকারিভাবে দেশে ফেরত আসে। এখন সে প্রতারক চক্রের সঙ্গে জড়িত কিনা, তা জানি না।’
- বিষয় :
- মানবপাচার
