ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

‘ছেলেড্যা যেন একবার বুকে ফিরে আসে’

‘ছেলেড্যা যেন একবার  বুকে ফিরে আসে’
×

বাদল ফরাজীর ছবি হাতে তাঁর ফেরার অপেক্ষায় আছেন মা শেফালী বেগম। বুধবার দুপুরে মোংলার কুমারখালীর মোর্শেদ সড়কে মেয়ের বাড়িতে সমকাল

মনিরুল হায়দার ইকবাল, মোংলা (বাগেরহাট)

প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৫৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

দরজায় সামান্য শব্দ হলেই চমকে ওঠেন বৃদ্ধ শেফালী বেগম। ঘোলাটে চোখে খুঁজে ফেরেন সেই চেনা মুখ– এই বুঝি ফিরে এলো তাঁর নাড়িছেঁড়া ধন। কিন্তু প্রতিবারই শেফালী বেগমের কাছে ফিরে আসে শূন্যতা আর অপেক্ষার দীর্ঘ প্রতিধ্বনি। এই মায়ের অপেক্ষার নাম বাদল ফরাজী। দীর্ঘ ১৮ বছর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস আর বুকফাটা হাহাকার যেন একাকার হয়ে আছে জরাজীর্ণ একটি উঠোনে।
গতকাল বুধবার দুপুরে মোংলা শহরতলির কুমারখালীর মোর্শেদ সড়কে বাদলের মা শেফালী বেগমের সঙ্গে কথা হয়। এই সড়কের টিএ ফারুক স্কুল-সংলগ্ন মেয়ে আকলিমা খাতুনের বাড়িতে ছিলেন তিনি। শেফালী বেগমের বয়স প্রায় ৭০। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার শেষ ইচ্ছা আমার ছেলেড্যার মুক্তি চাই। জানি না, আর কতদিন বাঁচমু! মরার আগে শুধু একবার ছেলেড্যার মুখডা দেইখা যাইতে চাই...।’ এ কথার মাঝেই বারবার ভেঙে পড়ছিলেন তিনি।

শেফালী বেগম জানালেন, তাঁর ছেলের চিন্তায় স্বামীও মারা গেছেন। এখন নিজেও শয্যাশায়ী। মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। তবুও তাঁর বুকের ভেতর থেকে একটা আকুতিই বেজে চলেছে– ‘ছেলেড্যা যেন একবার বুকের মধ্যে ফিরে আসে।’ তিনি বলতে থাকেন, প্রতি ওয়াক্ত নামাজ শেষে মোনাজাতে কারাবন্দি ছেলের জন্য দোয়া করেন। অসুস্থতার কারণে এবার না পারলেও গত বছর ও তার আগের বছর ছেলের মুক্তির জন্য আল্লার রহমত কামনায় ২০ ও ১০টি করে রোজা রেখেছেন।

শেফালী বেগম জানান, বাদল বেশ মেধাবী। ভারতে জেলে আটক অবস্থায় তিনি সম্পন্ন করেন স্নাতকসহ ৮টি ডিপ্লোমা কোর্স। বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজিতে দক্ষ হয়ে ওঠেন। এমনকি জেলের ভেতর অন্য বন্দিদের পড়াতেনও। ভালো আচরণের জন্য বাংলাদেশের কারাগারেও পেয়েছেন প্রশংসার সনদপত্র।
বাদলের মামা হাফেজ মো. দ্বীন ইসলাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাদল মেধাবী। দুরন্তপনার পাশাপাশি লেখাপড়াতেও ভালো ছিল। কিন্তু তাজমহল দেখার স্বপ্নই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। 
বাদলের বাবা আব্দুল খালেক ফরাজী পেশায় ছিলেন রেডিও মেকানিক। প্রতিবেশী জামাল পেদা বলেন, ছেলের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে তিনিও মারা গেছেন। এখন ছেলের অপেক্ষায় মা-ও মৃত্যুও প্রহর গুনছেন। সব স্বজনের মতো প্রতিবেশীরাও বাদলের মুক্তির অপেক্ষা করছেন।
তাজমহলের স্বপ্ন যখন অন্ধকারের কারণ

২০০৮ সালের ১৩ জুলাই। তখনও কৈশোর বাদলের। তাঁর স্বপ্ন ছিল একটাই– ভারতের আগ্রায় গিয়ে তাজমহল দেখা। বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ওই দেশে যান বাদল ফরাজী। তখন তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। কিন্তু সীমান্ত পেরোনোর পরপরই জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনার মুখোমুখি হন এই কিশোর। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাকে ‘বাদল সিং’ নামে এক খুনের আসামি ভেবে আটক করে। অথচ সেই ঘটনার সময় তিনি ভারতে প্রবেশই করেননি। ২০০৮ সালের ৬ মে দিল্লির অমর কলোনিতে এক বৃদ্ধা হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল দুই গৃহকর্মী। তাদের একজনের নাম বাদল সিং। সেই নামের মিলই কাল হয়ে দেখা দেয় বাংলাদেশের এই নিরপরাধ কিশোরের জীবনে। এই মামলায় পরবর্তী সময়ে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট দিল্লির সাকেত আদালত বাদলকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। আপিল করেও লাভ হয়নি। রায় বহাল থাকে। পরে মানবাধিকারকর্মীদের মাধ্যমে বিষয়টি বাংলাদেশ হাইকমিশনের নজরে আসে। দীর্ঘ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার পর ২০১৮ সালের ৭ জুলাই বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় দেশে ফেরানো হয় বাদল ফরাজীকে। কিন্তু মুক্তি আর মেলেনি। 
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারতীয় আইন অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ ১৪ বছর। সেই হিসাবে ২০২২ সালের ২০ জুলাই বাদল ফরাজীর সাজা শেষ হয়েছে। তারপরও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না আসায় মুক্তি পাচ্ছেন না তিনি। ইতোমধ্যে অতিরিক্ত প্রায় তিন বছর কারাভোগ করে ফেলেছেন বাদল।

ভাইয়ের জন্য ছোটাছুটি
এদিকে বাদলের মুক্তির বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা চেয়ে সরকারকে সাত দিনের সময় বেঁধে দিয়েছেন দেশের সচেতন নাগরিকরা। সোমবার ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ‘বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণ’-এর ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধনের আয়োজকরা জানান, এই সময়ের মধ্যে নির্দেশনা না এলে তারা কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। 
মানববন্ধনের ব্যানারে লেখা ছিল– ‘ভুল বিচারে ১৮ বছর, ভারত থেকে বাংলাদেশ! বাদল ফরাজীর মুক্তি কবে?’ এতে অংশ নিয়েছিলেন বাদলের বড় বোন আকলিমা খাতুন। তাঁর বাড়িতেই এখন ছেলের মুক্তির অপেক্ষায় আছেন মা শেফালী বেগম। 

ভাইয়ের মুক্তির জন্য ঢাকায় নানা জায়গায় ছোটাছুটি করছেন আকলিমা। গতকাল দুপুরে মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর সর্বশেষ ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেছেন। কিন্তু কোথাও উদ্যোগ দেখেননি। আকলিমা বলেন, ‘আমরা পাঁচ ভাইবোন। বাদল আমার ছোট। সে ছোটবেলা থেকেই একটু ভ্রমণপিপাসু। এই ভ্রমণের নেশায় তাজমহল দেখতে গিয়েছিল। আমার ভাইটি বিনা দোষে ১৮ বছর জেল খাটছে। সাজা শেষ হওয়ার পরও কয়েক বছর পার হয়ে গেছে। এখনও মুক্তি পায়নি। বাবাও ভাইয়ের চিন্তায় মারা গেছে। মা মৃত্যুশয্যায়। তাঁর শেষ ইচ্ছা ছেলের মুখ দেখা।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মোংলার সাধারণ সম্পাদক ও মানবাধিকারকর্মী মো. নূর আলম শেখের সঙ্গে এ বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যায় কথা হয় সমকালের। তাঁর চোখে, নামের বিভ্রান্তিতে বিনা অপরাধে ভারত ও বাংলাদেশের কারাগারে ১৮ বছর ধরে বাদল ফরাজীর বন্দি থাকার ঘটনা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। সরকারের উচিত দ্রুত সময়ের মধ্যে সব আইনি জটিলতা নিরসন করে তাঁকে মুক্তি দেওয়া। পাশাপাশি বাদলকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও দাবি জানান তিনি। 

আরও পড়ুন

×