ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাতদিন মেঘনায় ইলিশ শিকার, তীরেই বিক্রি

রাতদিন মেঘনায় ইলিশ শিকার, তীরেই বিক্রি
×

মো. আতোয়ার রহমান মনির, লক্ষ্মীপুর

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৫৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

মেঘনা নদীর বেশ কয়েকটি এলাকায় ইলিশ শিকারে মেতেছেন কিছু জেলে। পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই শিকার বেড়েছে বলে জানিয়েছেন আড়তদাররা। অভয়াশ্রম ঘোষিত এলাকায় নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ নিধনের বিষয়ে তাদের দাবি– ঋণের চাপ ও সরকারি সহায়তা না মেলায় জেলেরা নদীতে নামতে বাধ্য হয়েছেন। তারা অভিযোগ করেছেন, এ জন্য তাদের টাকা দিতে হচ্ছে মৎস্য বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাটকা রক্ষা ও ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে চাঁদপুরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকাকে ইলিশের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। গত ১ মার্চ থেকে এই এলাকায় মাছ শিকারে প্রায় দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়। যা ২০ এপ্রিল শেষ হবে। কিন্তু দিনের বেলায় প্রশাসনের অভিযান ও তৎপরতা থাকলেও রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে ফাঁকা হয়ে যায় নদী। তখন দলবেঁধে নেমে পড়েন জেলেরা। সারারাত জাল ফেলে ইলিশ শিকার করে ভোরে জেলেরা নদীপারে অস্থায়ী আড়ত বসান। চাহিদা বাড়ায় গত কয়েকদিন ধরে দিনেও শিকার বাড়ছে।

আড়ত মালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে লক্ষ্মীপুর শহরসহ আশপাশের এলাকায় ইলিশের চাহিদা বেড়ে গেছে। এ কারণে বাজারে দামও চড়া। মাঝারি আকারের ইলিশ ১২০০ থেকে ২০০০ টাকা, এক কেজি ওজনের ইলিশ তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অনেক ক্রেতা ইলিশের জন্য নদীর তীরে ভিড় করছেন। ভোরে বসানো ‘পকেট আড়ত’ থেকে তারা মাছ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বুড়িরঘাট, রায়পুর-চরভৈরবী সীমান্ত ও কমলনগরের মাতবরহাট, নাছিরগঞ্জ ও মতিরহাটসহ বিভিন্ন পয়েন্টে দিনরাত ইলিশসহ অন্যান্য মাছ শিকার চলছে। গতকাল শনিবার সকাল ১০টার দিকে এই প্রতিবেদক রায়পুর-চরভৈরবী সীমান্তের রুহুল আমিন মেম্বারের ঘাটে যান। ২০ মিনিট অবস্থানকালে সাতটি জেলে নৌকা ভিড়তে দেখা যায় এই ঘাটে। নৌকা থেকে জেলেদের জাটকা ইলিশ তুলে আনতে দেখা যায়। ঘাটে অপেক্ষমাণ ক্রেতারা টুকরি ধরে কেজিপ্রতি প্রায় ১০০ টাকা দরে মাছ কিনছেন। অনেকেই একসঙ্গে বেশি পরিমাণ জাটকা কিনে নেন। প্রতি টুকরির দাম আকার ভেদে ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। জেলেদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, প্রতি টুকরিতে ১০ থেকে ১৫ কেজি মাছ ধরে।
এদিন বিকেল ৩টার দিকে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মজুচৌধুরীর হাটের বুড়িরঘাটে ৩০ মিনিটে অবস্থানকালে পাঁচটি নৌকা ভিড়ে। একজন জেলেকে নৌকা থেকেই মাছ বিক্রি শুরু করতে দেখা যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন জেলে এসে যোগ দেন। উপস্থিত ক্রেতা ও পকেট আড়তদাররা মাছ আসার অপেক্ষায় ছিলেন। তারা নৌকা ঘাটে ভিড়তেই দ্রুত কিনে নিয়ে চলে যান। 
এদিক বিকেল ৫টার দিকে কমলনগরের মতিরহাট এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। ওই এলাকায় এক ঘণ্টায় ঘাটে ভিড়েছিল ১০টি নৌকা। সঙ্গে সঙ্গে পাইকারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে সাড়া পড়ে যায়। তারা ‘পাইকার, পাইকার’ বলে ডাকতে থাকেন। তাদের সঙ্গে দরাদরি করে জেলেরা কয়েক দফায় মাছ বিক্রি করে চলে যান। 

তিনটি জায়গা পরিদর্শনকালে বক্তব্য জানতে চাইলে কথা বলতেও রাজি হননি অনেকে। ক্রেতারা দ্রুতই চলে যান। মাছ বিক্রি করে জেলেরাও শিকারের জন্য আবারও নদীতে ফিরে যান। কয়েকজন জেলের অভিযোগ, তারা সরকারি সহায়তা পাননি। এ ছাড়া ঋণের কিস্তি শোধের চাপ রয়েছে। বাধ্য হয়েই তারা নদীতে নামছেন। অনেকে জানিয়েছেন, সরকারি তালিকায় তাদের নাম থাকলেও এখনও চাল পাননি।
কয়েকজন আড়ত মালিক বলেন, নববর্ষ সামনে রেখে অনেক জেলে নদীতে নামছেন। নিষিদ্ধ কারেন্ট জালের উৎপাদন বন্ধ না হলে জাটকা নিধনও বন্ধ হবে না। তাদের কেউই নাম প্রকাশে রাজি হননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জেলে জানান, কিছু অসাধু কর্মকর্তা টাকার বিনিময়ে মাছ ধরার সুযোগ দেন। টাকা না দিলেই তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়।
কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন। তাঁর দাবি, তাদের জনবল কম। তবু নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন। পহেলা 
বৈশাখ সামনে রেখে মেঘনায় অভিযান আরও জোরদার করা হবে। 
লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসানের সঙ্গে শনিবার রাতে কথা হয় সমকালের। তাঁর ভাষ্য, স্থানীয় লোকজন জানেন এখন ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ। নববর্ষ উদযাপনে লক্ষ্মীপুরের কোথাও পান্তা-ইলিশ আয়োজনের খবর পাননি। হয়তো কিছু জেলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করছেন। সংখ্যায় তা খুবই নগণ্য। তাদের আইনের আওতায় আনতে প্রশাসন তৎপর রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ইউএনও, এসিল্যান্ড, মৎস্য বিভাগ, কোস্টগার্ড, পুলিশ বিভাগকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনায় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এবার ইলিশ নিধনবিরোধী অভিযান সফল হবে বলে আশা করছেন।

আরও পড়ুন

×