বিহঙ্গ-কথা
পদ্মার চরের চখাচখি
রাজশাহীর পদ্মার চরে হাঁটছে চখাচখি হাঁসি লেখক
ড. আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৫০ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিরল কটি পাখির খোঁজে রাজশাহীর পদ্মা নদীর দশ নম্বর চরে যাওয়ার জন্য শহরের চর সাতবাড়িয়া এলাকার ডোগার ঘাটে এসেছি। সঙ্গে আছে রাজশাহীর পক্ষী আলোকচিত্রী মারুফ রানা এবং দুই সহযোগীসহ চুয়াডাঙ্গার পাখি ও বন্যপ্রাণিপ্রেমী বখতিয়ার হামিদ। সকাল ঠিক সাড়ে ৮টার সময় বয়োবৃদ্ধ জাকারুল মাঝি নৌকা ছাড়লেন। খানিকটা এগোনোর পর শীতকালে পদ্মা নদীতে ‘আআখ-আআখ...’ স্বরে সারাক্ষণ যে পাখিটি মাতিয়ে রাখে, তার একটি ছোট ঝাঁককে উড়ে যেতে দেখলাম। এরপর থেকে দশ নম্বর চরে আসা অবধি খানিক পরপর একটি, দুটি, পাঁচটি করে লালচে-কমলা রঙের পাখির দেখা পেতে থাকলাম।
পদ্মার দশ নম্বর চরে শ্যামলা কাঁকালসহ বেশ কটি বিরল পাখির খোঁজে এসেছি। এখানে ঘণ্টা পাঁচেক ছিলাম। বরই, বাবলা, শিমুল, আকন্দ ও ঝোপঝাড়ে পূর্ণ চরটি দেখতে যেন কতকটা আফ্রিকার সাভানা অঞ্চলের মতো।
ফিরতি পথে আবারও লালচে রঙের অতি সুন্দর পাখিগুলোকে নদীজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখলাম। কোনটা নদীর পানিতে ভাসছে, কোনটা চরের বালুতে হাঁটছে, আবার কোনটা নদীর ওপর আকাশে ওড়াউড়ি করছে। পরের দিন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুরের চরইল বিলে গিয়েও ওদের এক বিশাল ঝাঁকের দেখা পেলাম। গত এক যুগ ধরে এ পাখিগুলোকে শীতে রাজশাহীর পদ্মা নদীতে দেখছি। পদ্মায় গিয়ে লালচে-কমলার পাখিগুলোকে না দেখলে কেন জানি ভালো লাগে না।
রাজশাহীর পদ্মা নদীর এ পাখিগুলো এ দেশের এক প্রজাতির পরিযায়ী হাঁস চখাচখি। সচরাচর দৃশ্যমান এই হাঁসগুলো চখাচখি, চকা-চকি, লাল চখা, লালা বা মানিকজোড় হাঁস নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Ruddy Shelduck বা Brahminy Duck। অ্যানাটিডি (Anatidae) বা হাঁস গোত্রের এই পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Tadorna ferruginea (টাডরনা ফেরুজিনিয়া)। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ থেকে মধ্য এশিয়া, বৈকাল হ্রদ ও মঙ্গোলিয়া হয়ে চীনের পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে পশ্চিম আফ্রিকা ও ইথিওপিয়াতেও কিছু আবাসিক পাখি দেখা যায়। শীতে ওরা বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে পরিযায়ন করে।
প্রাপ্ত বয়স্ক চখাচখির দেহের দৈর্ঘ্য ৫৮-৭০ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ১১০-১৩৫ সেন্টিমিটার ও ওজন ৯২৫-১,৬৪০ গ্রাম। দেহের রঙে-ঢঙে অন্যান্য পরিযায়ী হাঁসের চেয়ে চখাচখি বেশ আলাদা। হাঁসা-হাঁসি দেখতে প্রায় একই রকম হলেও আকারে হাঁসা কিছুটা বড়। হাঁসার পালক মরচে-কমলা, মুখমণ্ডল সাদা, মাথা ও ঘাড় হলদে-বাদামি। ডানা-ঢাকনি সাদা, প্রান্ত-পালক ও লেজ কালো। ডানার উজ্জ্বল সবুজ পতাকা ওড়ার সময় স্পষ্ট দেখা যায়। প্রজনন ঋতুতে গলায় কালো মালা দেখা যায়। হাঁসির মুখমণ্ডল বেশি সাদা, মাথা ফিকে ও গলায় মালা হয় না। হাঁসা-হাঁসি নির্বিশেষে উভয়েরই চোখ বাদামি। ঠোঁট, পা ও পায়ের পাতা কালো। অপ্রাপ্তবয়স্ক হাঁস দেখতে হাঁসির মতোই, কিন্তু ফ্যাকাশে। পিঠ বাদামি, ডানার গোড়ার পালক ও ডানা-ঢাকনি ধূসর।
শীতে ওদের পুরো দেশের নদনদী ও জলাশয়ে বিচরণ করতে দেখা যায়। সচরাচর জোড়ায় বা ছোট দলে বিচরণ করে। কাদামাটি ও স্বল্প পানিতে খাবার খোঁজে। জলজ আগাছা, উদ্ভিদ, মাছ, ব্যাঙ, পোকামাকড়, শামুক, কাঁকড়া ইত্যাদি খায়। ওড়ার সময় ‘চূর-চূর-চূর...’ বা ‘আআখ-আআখ...’ এবং ভয় পেলে ‘আঙক-আঙক-আঙক...’ শব্দে ডাকে।
মে থেকে জুন প্রজননকাল। এ সময় মূল আবাস এলাকার উঁচু মালভূমির মধ্যে অবস্থিত হ্রদ বা জলাশয়ের বালু বা কাদাময় পাড়ে গর্ত করে তাতে বুকের ঝরে পড়া পালক বিছিয়ে বাসা বানায়। হাঁসি ৮-৯টি ধবধবে সাদা রঙের ডিম পাড়ে। হাঁসা বাসা পাহারা দেয় ও হাঁসি একাই ডিমে তা দেয়। ডিম ফোটে ২৮-২৯ দিনে। ওড়া শিখে স্বাবলম্বী হতে ৫৫-৬০ দিন সময় লাগে। আয়ুষ্কাল ১০-১৫ বছর।
লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন
ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
