ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বৃষ্টিতে গলে গেছে শত শত চাষির লবণ

বৃষ্টিতে গলে গেছে শত শত চাষির লবণ
×

বৃষ্টিতে গলে যাওয়া লবণের ঘেরে পলিথিনের স্তূপ। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার পশ্চিম বড় ভেওলা এলাকায় সমকাল

ইব্রাহিম খলিল মামুন, কক্সবাজার, এম আর মাহমুদ, চকরিয়া ও শাহাব উদ্দীন, মহেশখালী

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ০৮:১৭ | আপডেট: ০১ মে ২০২৬ | ১১:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

কক্সবাজারে বৈরী আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের কারণে নির্ধারিত সময়ের ১৫ দিন আগেই চলতি মৌসুমের লবণ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। চাষিরা বলছেন, লবণ উৎপাদনে যে খরচ হচ্ছে, সেই তুলনায় দাম মিলছে কম। ফলে মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের আগেই লবণ উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন তারা। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন লবণচাষ ও বিপণনে জড়িত অন্তত ৫০ হাজার মানুষ।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলার দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নে দেখা গেছে, বঙ্গোপসাগর ঘেঁষে কয়েকশ একরের লবণের মাঠ। কয়েকটি জায়গায় সাদা লবণ স্তূপ করে রাখা। বিশাল মাঠে লবণ সংগ্রহে কাজ করছিলেন হাতেগোনা কয়েকজন শ্রমিক। মাঠে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কালো পলিথিন। শ্রমিকরা জানান, বৃষ্টিতে লবণ নষ্ট হবে, তাই মাটি গর্ত করে নিচে রাখা হচ্ছে লবণ। কিছু গুদামে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

ওই এলাকার চাষি নুরুল কবির বলেন, ‘একবার বৃষ্টি হলে টানা ৭ থেকে ৯ দিন লবণ উৎপাদন বন্ধ থাকে। যদি বৃষ্টিপাত না হতো, আমরা আরও  বেশ কিছু লবণ উৎপাদন করতে পারতাম।’

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) দেওয়া তথ্যমতে, দেশে লবণের চাহিদা ২৭ লাখ ৩৫ হাজার টন। চলতি মৌসুমে (১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে পর্যন্ত) কক্সবাজার সদর, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, চকরিয়া, ঈদগাঁও, টেকনাফ ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণ উৎপাদন হয়েছে। ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত লবণ উৎপাদিত হয়েছে ১৪ লাখ ৫০ হাজার টন। গত মৌসুমে একই সময়ে যা ছিল ১৮ লাখ ২২ হাজার ১৬২ টন। চলতি মৌসুমে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২৮ লাখ ১০ হাজার টন। কর্মকর্তারা তা অর্জিত হবে কিনা, তা নিয়ে শঙ্কিত।

মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নের কালালিয়া কাটা এলাকার নুরুল কবির বড় চাষি। তিনি প্রায় ৮০ একর জমিতে লবণ উৎপাদন করেন। সব মিলিয়ে তাঁর প্রতি একর জমিতে খরচ হয়েছে দেড় লাখ টাকা। এই পরিমাণ জমিতে তাঁর লবণ উৎপাদন হয় ২৫০ মণ। ২৬০ টাকা দরে বিক্রি করে আয় হয়েছে মাত্র ৬৫ হাজার টাকা। পুরো জমিতে তাঁর মোট লোকসান হয়েছে প্রায় ৭০ লাখ টাকা।

নুরুল কবিরের ভাষ্য, মৌসুমের শুরুতে লবণের মণ ছিল মাত্র ২০০ টাকা। শেষ সময়ে এসে ৩০০ টাকায় উঠেছে। কিন্তু অকাল বৃষ্টি সব লাভ কেড়ে নিয়েছে। যদি আগামী ১৫-২০ দিন আবহাওয়া অনুকূলে থাকে ও লবণের দাম বাড়ে, তবেই হয়তো বিশাল ক্ষতির কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। 

কয়েক দিনের বৃষ্টিতে হারিয়ারঘোনার চাষি আনচার উল্লাহর ঘেরের ২৫০ মণ লবণ ভেসে গেছে। এর পর থেকে তিনি লবণ উৎপাদন বন্ধ করে দেন। আনচার উল্লাহ বললেন, এপ্রিল মাসে আরও ঝড়বৃষ্টি হবে, সেই আশঙ্কায় তিনি মাঠ সংস্কার করছেন না। 

একই পরিস্থিতির কথা জানান কুতুবজোমের চাষি নবাব মিয়াও। তিনি বলেন, মৌসুমের শুরুতে (নভেম্বর-ডিসেম্বর) ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহ ছিল। এ কারণে লবণ চাষিদের মাঠে নামতে ২০-২৫ দিন দেরি হয়েছে। এখন আবার বৈরী আবহাওয়ার কারণে ১৫-২০ দিন আগেই মাঠ ছাড়তে হচ্ছে। এ কারণে লবণ উৎপাদন এবার অর্ধেকে নেমে এসেছে। অধিকাংশ চাষি ঋণ ও দাদনের টাকায় লবণ উৎপাদনে নামেন। উৎপাদন কম হওয়ায় ঋণ পরিশোধ নিয়েই তাদের যত দুশ্চিন্তা।

চকরিয়ার লবণ চাষি গিয়াস উদ্দিনের দেওয়া তথ্যমতে, গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে উপজেলার ৭০০ থেকে ৮০০ একর মাঠে লবণ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় আগে উৎপাদিত লবণও বিক্রি করা যাচ্ছে না। গিয়াস উদ্দিন বললেন, ‘এক মণ লবণ উৎপাদনে খরচ হয় ৩০০ টাকা, কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে ২৫০-২৬০ টাকায়। লোকসান দিয়ে আর কত লবণ বিক্রি করব?’

এদিন টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা, রঙিখালী, ঝিমংখালী, খারাংখালী ও মৌলভীবাজার এলাকার বেশির ভাগ লবণ মাঠে উৎপাদন বন্ধ দেখা যায়। রঙিখালীর চাষি নবী হোসেন বলেন, ‘কালবৈশাখী ও বৃষ্টি কারণে তিন-চার দিন ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এরপর ১০-১৫ দিনের জন্য মাঠ সংস্কার করে লাভ নেই।’

অপর চাষি জালাল আহমদ বলেন, আগামী ১৫ মে লবণ উৎপাদনের মৌসুম শেষ। এখন বৃষ্টির যা অবস্থা, লবণের দাম না বাড়লে চাষিরা নতুন করে উৎপাদন শুরুর ঝুঁকি নেবেন না। পরিস্থিতি বিবেচনায় দাম অন্তত মণপ্রতি ৪০০ টাকা হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। 

লবণ উৎপাদনে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়ে শঙ্কিত বিসিক কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া। তিনি বৃহস্পতিবার সমকালকে বলেন, ২৮, ২৯ ও ৩০ এপ্রিলের ভারী বর্ষণে শতভাগ লবণ মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পর থেকে লবণ উৎপাদন বন্ধ আছে। বৃষ্টির পানিতে শত শত চাষির লবণ গলে (নষ্ট) গেছে। 

জেলায় প্রান্তিক চাষির সংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার উল্লেখ করে জাফর ইকবাল ভূঁইয়া আরও বলেন, চলতি মৌসুমে শুরুতেই শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারণে চাষিদের লবণ উৎপাদনে নামতে ২০-২৫ দিন দেরি হয়। উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্যও পাওয়া যাচ্ছে না। মৌসুমের শেষ মুহূর্তে এসে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা দিশা হারিয়ে ফেলছেন। 
 

আরও পড়ুন

×