ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

হাসপাতাল চালুর আগেই চুরি যাচ্ছে যন্ত্রাংশ

হাসপাতাল চালুর আগেই চুরি যাচ্ছে যন্ত্রাংশ
×

শরীয়তপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ০৮:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা নিয়ে শরীয়তপুরের নড়িয়ায় নির্মিত হয়েছে ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সেটি চালুর আগেই সেখান থেকে কয়েক দফায় ৩৪-৩৫ লাখ টাকার পণ্য চুরি গেছে। শুক্রবার (১ মে) রাতে নড়িয়া পৌরসভার বৈশাখীপাড়া এলাকায় সর্বশেষ দফায় চুরি হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় লোকজন ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ১৯৬২ সালে নির্মিত নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি সদরের প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার দূরে কেদারপুর ইউনিয়নের মুলফৎগঞ্জ এলাকায় পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত। ওই হাসপাতাল কমপ্লেক্সটি ২০১৮ সালে ভয়াবহ নদী ভাঙনের শিকার হয়। তিনতলা বিশিষ্ট মূল ভবন নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। চিকিৎসাসেবা চালু রাখতে সরকারি কোয়ার্টার ও একটি পরিত্যক্ত ভবনে কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয়। ৫০ শয্যার হাসপাতালে এখন ২৫ শয্যার কাজ চলছে। জায়গার অভাবে এক্স-রে মেশিন স্থাপন করা যাচ্ছে না। প্যাথলজি ও অপারেশন থিয়েটারও চলছে সীমিত পরিসরে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ৫১ কোটি টাকা খরচে নড়িয়া পৌরসভার বৈশাখীপাড়ায় আধুনিক হাসপাতাল কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। চারতলা বিশিষ্ট মূল ভবনের পাশাপাশি এতে রয়েছে চিকিৎসক ও নার্সদের আবাসিক কোয়ার্টারসহ মোট ছয়টি ভবন। এতে উন্নত চিকিৎসাসেবার সব ধরনের যন্ত্রাংশ স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য রাখা হয়েছে পাঁচ শয্যার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)।

২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর হাসপাতালটি উদ্বোধনের কথা ছিল। কিন্তু কেদারপুর এলাকার বাসিন্দা মাসুদুর রহমান দেওয়ান পুরোনো জায়গায়ই হাসপাতাল চালুর দাবিতে উচ্চ আদালতে রিট করেন। এতে পুরো প্রক্রিয়াটি স্থগিত হয়ে যায়। গত দুই বছরে কয়েক দফা উদ্যোগ নেওয়া হলেও আইনি জটিলতা কাটেনি। বিগত সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে শরীয়তপুর-২ (নড়িয়া-ভেদরগঞ্জ) আসনের এমপি শফিকুর রহমান কিরণ সেটি দ্রুত চালুর আশ্বাস দেন। তবে এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি।

এলাকাবাসীর দেওয়া তথ্যমতে, নতুন হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় শুরুতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খান এন্ড ফ্রন্ট বাংলাদেশের কিছুদিন নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ দেয়। পরবর্তীতে তাদের প্রত্যাহার করা হয়। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এই কমপ্লেক্সে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। কিন্তু নির্বাচনের পর সেনা সদস্যরা চলে গেলে হাসপাতালটি অরক্ষিত হয়ে পড়ে। এরপর থেকেই চোরচক্রের দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকে।
সর্বশেষ গত শুক্রবার রাতে হাসপাতালের বিভিন্ন ভবনের তালা ভেঙে জেনারেটরের কয়েল, তিনটি এসি, এসির যন্ত্রাংশসহ স্টোররুমের মূল্যবান সামগ্রী লুটে নেয় দুর্বৃত্তরা। স্থানীয় লোকজন বলছেন, আগেও এখানে একাধিকবার চুরি হয়েছে। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 
বৈশাখীপাড়ার বাসিন্দা রুবেল খান বলেন, এই হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা আছে। কিন্তু চালু না করায় মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। উল্টো কোটি টাকার মালপত্র চুরি হয়ে যাচ্ছে। দেখার মতো কেউ নেই। ভবিষ্যতেও যে চুরি হবে না, তাঁর কোনো নিশ্চয়তা নেই।

অপর বাসিন্দা মোহাম্মদ আলম শেখ বলেন, ‘এত বড় হাসপাতাল থাকার পরও আমরা চিকিৎসার জন্য জেলা শহর বা ঢাকায় যেতে বাধ্য হচ্ছি। সময়মতো হাসপাতাল চালু হলে এসব চুরি হতো না।’ দ্রুত আইনি জটিলতা সমাধান করে এটি চালু করা উচিত বলেও মনে করেন তিনি। 
শুক্রবারের চুরির বিষয়ে নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাহার মিয়া জানান, তালা ভাঙার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তারা দেখেছেন, জেনারেটরের কয়েল, তিনটি এসি ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ চুরি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করে অভিযোগ দিলে তদন্তের পর ব্যবস্থা নেবেন। 

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী দেবব্রত হালদার বলেন, চুরির ঘটনায় নড়িয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তাদের ধারণা, প্রায় ৩৫ লাখ টাকার সরঞ্জামাদি চুরি ও নষ্ট হয়েছে। এর আগেও দুই দফায় হাসপাতালের বাইরে ছোটখাটো কিছু সামগ্রী চুরি হয়েছে। শুক্রবার গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা হাসপাতালের প্রধান ফটকের তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। পরে তারা বিভিন্ন মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম নিয়ে যায়। এমনকি কিছু নষ্ট করে রেখে যায়।
নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল কাইয়ুম খান বলেন, হাসপাতালটি হস্তান্তর না হওয়ায় স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দায়িত্বে আছে। তারা চুরির ঘটনায় অভিযোগ পেয়েছেন। বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে। তদন্তের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন বলেন, ‘হাসপাতালটি এখনো আমাদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়নি। তাই রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের।’
 

আরও পড়ুন

×