বেরোবির উপাচার্য ড. শওকাতের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ
বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে চুকিয়েছেন স্ত্রীর শাড়ির দাম
ফাইল ছবি
আলতাফ হোসেন দুলাল, রংপুর
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০২:১৬
সরকারি বাংলোয় থেকেও ছয় মাসের বাড়িভাড়া নিয়েছেন। গাড়ির জ্বালানি খরচ দেখিয়েছেন কয়েক গুণ বেশি। স্ত্রীর জন্য কেনা শাড়ির দামও চুকিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে। গবেষণা প্রকল্প ও সেমিনারের টাকা তুলে নিয়েছেন বিধিবহির্ভূতভাবে। এবার এমন নানা অভিযোগ উঠেছে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলীর বিরুদ্ধে। তবে, তিনি এসব অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন।
ড. শওকাত আলী ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বেরোবির ষষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে যোগ দেন। তিনি ট্রেজারারের দায়িত্বও পালন করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলার তদন্ত চলছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারী জানিয়েছেন, ড. শওকাত আলী উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম তিন দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউসে থাকেন। পরে তিনি নির্ধারিত সরকারি বাংলোয় ওঠেন। তবে, তিনি ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ছয় মাসে বাড়িভাড়া বাবদ এক লাখ ৯৬ হাজার ৪১৮ টাকা নিয়েছেন।
এ বিষয়ে বেরোবির সাবেক রেজিস্ট্রার হারুন অর রশিদ বলেন, ‘আমি ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগ দিয়েই দেখতে পাই উপাচার্য সরকারি বাংলোয় বসবাস করছেন। পরে শুনেছি, তিনি বাসা ভাড়া বাবদ ছয় মাসের টাকা তুলে নিয়েছেন।’
এ ছাড়া অভিযোগ উঠেছে, উপাচার্য তাঁর স্ত্রীর জন্য ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি ঢাকার একটি বিপণিবিতান থেকে একটি শাড়ি কেনেন। দাম দুই হাজার ৭৩৯ টাকা। সেই টাকাও তিনি ভাউচারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে নিয়েছেন। ভিসির নির্দেশে ওই সময়ে দপ্তরের বিভাগীয় আনুষঙ্গিক খাতের অর্থ দিয়ে উপাচার্যের দপ্তরের সেকশন কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান এক লাখ ৫০ হাজার টাকা ১৮৪টি ভাউচারের মাধ্যমে সমন্বয় করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা প্রকল্পের খাত থেকে অর্থ গ্রহণ নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। উপাচার্য হিসেবে ড. শওকাত আলীর গবেষণা খাত থেকে টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। তবুও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকল্প থেকে বিধিবহির্ভূতভাবে প্রথম ধাপে তিন লাখ টাকা এবং পরের ধাপে ট্রেজারার হিসেবে দুই লাখ টাকা তুলে নিয়েছেন তিনি। একই সময়ে বিধিবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন সেমিনারের সম্মানী হিসেবে আরও চার লাখ ৮০ হাজার টাকা গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে।
গাড়ির জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। উপাচার্যের জন্য বরাদ্দ পাজেরো স্পোর্টস জিপ তিনি রংপুরে ব্যবহার করেন। ট্রেজারারের জন্য বরাদ্দ আরেকটি জিপ বিধিবহির্ভূতভাবে ঢাকায় তাঁর স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৯ মাসে উপাচার্য হিসেবে আট লাখ পাঁচ হাজার টাকা এবং ট্রেজারার হিসেবে আরও পাঁচ লাখ ২০ হাজার টাকা গাড়ির জ্বালানি ব্যয় দেখানো হয়েছে। এতে গাড়ি দুটির মোট জ্বালানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিধি অনুযায়ী উপাচার্যের গাড়ির মাসিক জ্বালানি প্রাপ্যতা ছিল সর্বোচ্চ ২০০ লিটার। সে হিসাবে ৯ মাসে সর্বোচ্চ এক হাজার ৮০০ লিটার জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও তিনি প্রায় ১০ হাজার ৫০০ লিটার জ্বালানি ব্যবহার দেখিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, উপাচার্য ড. শওকাত আলী বেরোবির কর্মচারীদের ঢাকার বাসায় ব্যক্তিগত কাজে খাটান। যোগদানের পর থেকে তিনি বেরোবি থেকে প্রতি মাসে তিনজন করে কর্মচারী ঢাকার বাসায় পাঠান।
গত এপ্রিল মাসে বেরোবির এমএলএস তরিকুল ইসলাম, হযরত আলী ও মকবুল হোসেনকে ঢাকার বাসায় পাঠিয়ে ব্যক্তিগত কাজ করানো হয়েছে বলে তারা সমকালকে নিশ্চিত করেছেন।
কর্মকর্তা বলেন, উপাচার্যের রংপুরের ডাকবাংলোর বাসায় ১২ জন নিরাপত্তা কর্মী, ছয়জন এমএলএসএস, দুজন বাবুর্চি এবং একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী রয়েছেন।
এর আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতি, অপরাধমূলক অসদাচরণ ও উত্তরপত্র পরিবর্তনের অভিযোগে উপাচার্য ড. শওকাত আলীর বিরুদ্ধে দুদকের একটি মামলার তদন্ত চলছে। ২০২৩ সালের ১৫ জুন দুদকের ঢাকা-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলাটি করা হয়।
বৃহস্পতিবার মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে বেরোবির উপাচার্য ড. শওকাত আলী প্রথমে চুপ করে অভিযোগগুলো শোনেন। এর পর বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘তাই নাকি! কোথায় পেলেন এত অভিযোগ, কে দিল? রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন সব কাগজপত্র দেখাব।’ সমকালের হাতে ভাউচারসহ বেশ কিছু কাগজপত্র থাকার কথা জানালে তিনি থতমত খেয়ে বলেন, ‘ঠিক আছে, আমিও কাগজ দেখাব আসেন। আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সঠিক নয়।’
- বিষয় :
- বেরোবি
