ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

বিএনপির রেকর্ডসংখ্যক প্রার্থী হতে চান কাউন্সিলর

জনগণ না চিনলেও হতে চান ‘জনপ্রতিনিধি’

কোনো ওয়ার্ডে ১২, কোনো ওয়ার্ডে ১৫ জনের বেশি আগ্রহী

জনগণ না চিনলেও হতে চান ‘জনপ্রতিনিধি’
×

 শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৭:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

কেউ স্থানীয় যুবদলের সদস্য, কেউ স্থানীয় বিএনপির কর্মী। কেউ আবার ধর্মীয়, সামাজিক কিংবা নামসর্বস্ব সংগঠনের নেতা। যাদের অধিকাংশকেই এলাকার জনগণ চেনে না। তবু তারা সবাই হতে চান ‘জনপ্রতিনিধি’। 

ভোটাররা না চিনলেও বিভিন্ন উপলক্ষকে ইস্যু করে পোস্টার, ব্যানার টাঙিয়ে নিচে লিখছেন ‘প্রচারে ওয়ার্ড এলাকার সর্বস্তরের জনসাধারণ’। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে বিএনপির টিকিটে কাউন্সিলর হতে মরিয়া তারা। 
চসিকের ৪১টি ওয়ার্ডের কোনোটিতে ১০ জন, কোনোটিতে আবার ১২ থেকে ১৫ জনও প্রার্থী হতে চান বিএনপি থেকে। ১৭ বছর পর দল ক্ষমতায় আসায় এলাকায় নানা কৌশলে প্রার্থী হওয়ার বার্তা দিচ্ছেন তারা।

সবুজ সংকেত না পেলেও নির্বাচন সামনে রেখে কাউন্সিলর হওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। বিভিন্ন দিবসকে উপলক্ষ করে অলি-গলিতে মন্ত্রী, মেয়র, এমপিসহ দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিজেদের ছবি দিয়ে পোস্টার, ব্যানার টাঙিয়ে প্রার্থী হওয়ার বার্তা দিচ্ছেন। অনেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে পাঠাচ্ছেন ক্ষুদেবার্তাও। স্থানীয় এমপি ও নেতাদের বাসায় সৌজন্য সাক্ষাৎ, এসএসসি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে পানি বিতরণ, কম আয়ের মানুষদের মাঝে সুলভ মূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিক্রিসহ ধর্মীয়-সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার মতো কর্মসূচিও পালন করছেন ‘আগামীর কাউন্সিলর প্রার্থীরা’। 
নগর বিএনপির সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক ও চসিক তিন নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী মো. ইদ্রিস আলী সমকালকে বলেন, ‘১৯৮৮ সাল থেকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আওয়ামী লীগের দমনপীড়ন ও দলের দুঃসময়ে মাঠে সক্রিয় থেকে নেতাকর্মীদের পাশে ছিলাম। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও সংগঠনকে সুসংগঠিত রাখতে ভূমিকা রেখেছি। হুমকি-ভয় উপেক্ষা করে কাঠখড় পুড়িয়ে দলীয় বিবৃতি, নিউজ সংবাদমাধ্যমে পাঠিয়েছি। এলাকায় আমার পরিচিতিও আছে। অনেকেই দল থেকে মনোনয়ন চাইলেও আশা করছি, দল আমার দীর্ঘদিনের ত্যাগ, ইতিবাচক ভূমিকাকে মূল্যায়ন করবে।’ পাথরঘাটা ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ইসমাইল বালি বলেন, ‘সবশেষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ভোট ডাকাতি করে ওয়ার্ডটি দখল করে নিয়েছিল; যার সাক্ষী এলাকার বাসিন্দারাও। তবে চেয়ার দখল করলেও আমি সবসময় এলাকার মানুষের পাশে ছিলাম, এখনও আছি। তরুণ-প্রবীণ অনেকেই মনোনয়নপ্রত্যাশী হলেও দল আমার ওপর আস্থা রাখবে বলে বিশ্বাস।’

পাঁচলাইশ ওয়ার্ডে নগর বিএনপির সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক ইদ্রিস আলী কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে আগেভাগে ঘোষণা দিয়ে মাঠে নামলেও, একই ওয়ার্ডে নিজ দলের অনেকেই প্রার্থী হতে চান। এর মধ্যে রয়েছেন মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক জিএম আইয়ুব খান, থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের জসিম, যুবদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মনজুরুল আলম মঞ্জু, বিএনপি নেতা মোহাম্মদ ইসমাইল, ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস কফিল উদ্দীন, ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আবু, ছাত্রদল নেতা জাহেদ হোসেন, শাহীন রেজাসহ আরও কয়েকজন।

৬ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ডেও ডজনের বেশি নেতাকর্মী কাউন্সিলর হতে আগ্রহী। এর মধ্যে রয়েছেন সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ হাসান লিটন, ছাত্রনেতা ম হামিদ, হুমায়ুন রশীদ, বিএনপি নেতা হাজী মুহাম্মদ ইলিয়াস, যুবদলের সাবেক সহ-কর্মসংস্থানবিষয়ক সম্পাদক সাইদুল ইসলাম, নগর বিএনপির সাবেক আপ্যায়ন সম্পাদক আব্দুল আজিজ, স্থানীয় নেতা সিরাজুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন।
১২ নম্বর সরাইপাড়া ওয়ার্ডে সাবেক কাউন্সিলর হাজী বাবুল হক, যুবদলের সাবেক সহসভাপতি নুর আহাম্মেদ, ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য সচিব ফখরুল হাসান, নগর যুবদলের সাবেক সহসভাপতি একেএম ফজলুল হক, সাবেক সদস্য দিদারুর রহমান, থানা যুবদলের সাবেক সদস্য সচিব শওকত খান রাজু, যুগ্ম আহ্বায়ক খন্দকার মো. রাজিবুল হক, থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব সালাউদ্দীন রাসেল মির্জাসহ কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম শোনা যাচ্ছে। 
৪ নম্বর চান্দগাঁও ওয়ার্ডে সাবেক কাউন্সিলর মাহবুবুল আলম, ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক ইলিয়াস চৌধুরী, ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, মহানগর যুবদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য্য, কৃষিবিষয়ক সম্পাদক নুরুল আমিন, থানা যুবদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক খোরশেদ আলম, ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক আবু বক্কর, সাবেক সদস্য জসিম উদ্দীন, বিএনপি নেতা কামাল উদ্দীন। অন্যান্য ওয়ার্ডের অবস্থাও একইরকম।

পাঁচলাইশ ওয়ার্ডের বাসিন্দা শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘এলাকায় অমুক ভাই, তমুক ভাইয়ের শুভেচ্ছা ব্যানার, পোস্টার দেখা যাচ্ছে। অনেকের ছবি দেখে আঁৎকে উঠছেন বাসিন্দারা। কারণ তাদের চেহারা কখনও দেখেননি তারা।’
সিটি করপোরেশনের কয়েকজন পরিচ্ছন্নকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে এলাকার অলি-গলিতে কিছুদিন পর পর উঠছে শত শত ব্যানার-পোস্টার। কাউন্সিলর পদপ্রার্থী হিসেবে নিজেদের তুলে ধরছেন অনেকেই। অপসারণের কয়েকদিনের মাথায় আবারও লাগানো হচ্ছে। এতে আমরা বিব্রত।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর দল ক্ষমতায় আসায় চসিক নির্বাচনে অনেকেই কাউন্সিলর প্রার্থী হতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তবে নিজেকে, নিজের পদকে ও দুঃসময়ে দলের জন্য নিজের ভূমিকাকে মূল্যায়ন না করে প্রার্থী হওয়ার বার্তা দেওয়া উচিত নয়। কারণ দল ক্ষমতায় বলে যে কাউকেই প্রার্থী করবে এটি ভুল ধারণা। প্রার্থী হওয়াটা গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও জনপ্রতিনিধি হতে অনেক যোগ্যতার প্রয়োজন হয়।

আরও পড়ুন

×