ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

ধান পানির তলে, কিস্তির চিন্তায় ঘুম হয় না নিরঞ্জনদের

ধান পানির তলে, কিস্তির চিন্তায়  ঘুম হয় না নিরঞ্জনদের
×

বৃষ্টির কারণে ধান শুকাতে পারেননি অজি উল্যাহ। তাই চারা গজিয়ে গেছে। গতকাল শুক্রবার কিশোরগঞ্জের নিকলী থেকে তোলা- সমকাল

 বিজয় কর রতন (মিঠামইন) কিশোরগঞ্জ 

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৯:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘২০ হাজার টেহায় পচা ধান কাডাইয়া কী করমু, পানির নিচে রইছে পইড়া থাকুক, মাছে খাইবো নে। সমিতির বেডা ঘুরতাছে, আইলে কী কমু– চিন্তায় ঘুমাইতে পারতাছি না।’ 
কথাগুলো কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কুমারদিঘা হাওরের কৃষক নিরঞ্জন দাসের। গতকাল শুক্রবার হাওরের জমি থেকে আসার রাস্তায় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়। হাঁটতে হাঁটতে তাঁর সঙ্গে হাওরের ফসলহানির বিষয়ে কথা হয়। 

নিরঞ্জন দাস জানান, তিনি কুমারদিঘা হাওরে এক একর ২৫ শতাংশ জমি বন্ধক নিয়েছিলেন। সেই জমিতেই এ বছর ধান আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এক ধারে জমি পাকছে, অন্য ধারে বৃষ্টি নামা শুরু হইছে। বৃষ্টির পানিতে আমার জমি অহন এক হাত পানির তলে। রোইদ উঠলে কী হয়বো, পানি তো কমতাছে না। পানির তলে পচা ধান কাইট্টা আনলে দাউয়ালরে (শ্রমিক) ২৫ হাজার টেহা দেওন লাগবো। পল্লী বিকাশ সমিতি থেইক্কা ৭০ হাজার টেহা ঋণ লইছি। ক্ষেত করতে ৬০ হাজার টেহা গেছে। অহন যে অবস্থা ২৫ হাজার টেহার ধানই পাইতাম না। মা গঙ্গারে দিয়া আইয়া পড়ছি। কই থেইক্কা সমিতির ঋণ দিমু, খাইমু চলমু, হেই চিন্তায় অহন আর বালা লাগে না। পুলাডা এইবার ম্যাট্রিক (এসএসসি) পরীক্ষা দিতাছে।’ 
কথা বলতে বলতে নিজের ঘরের সামনে এসে মাটিতে বসে পড়েন নিরঞ্জন দাস। খলাপাড়া আশ্রমে জমি নিয়ে এই ঘর তুলে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। নিজের জমি নেই। একমাত্র ছেলে গোবিন্দ দাসকে পড়াশোনা করাচ্ছেন কষ্ট করে। সে পড়াশোনার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে ওয়ার্কশপের দোকানে কাজ করে বাবাকে পরিবারের ভরণপোষণে সহায়তা করে। নিরঞ্জনও সারা বছর অন্যের কাজ করে সংসার চালান। পাশাপাশি ঋণ নিয়ে ধানের আবাদও করেন।  

উপজেলার ঘাগড়া গ্রামের কৃষক তোফাজ্জল মিয়া জানান, নৌপোষা হাওর, ফোরদিঘার হাওর ও বেহারকোনা হাওরে ২১ কিয়ার (এক কিয়ারে ২৫ শতাংশ) জমিতে আবাদ করেছিলেন। মাত্র ১২ কিয়ার জমির ধান কাটা হযে়ছে। বাকি ৯ কিয়ার জমির পানির ধান ১০ দিন ধরে নিচে। গ্রামের পাশের ধানের খলায় গেলে কথা হয় তোফাজ্জল মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কাডা ধানে গ্যাজ (চারা গজেছে) উঠেছে। ধান কিনার বেপারিও নাই। গ্যাজা ধান কেউ কিনেও না। আইজ রোইদ উঠছে, গ্যাজা ধান লাইড়া দিছি। ১২ কিয়ার ক্ষেতে আড়াইশ মণ ধান হইতো। অহন শুকাইয়া খালি ৫০ মণ হইবো কিনা জানি না। সমিতি থেইক্কা এক লাখ টেহা ঋণ লইছিলাম। জমি করতে খরচ গেছে দুই লাখ। সমিতির ঋণ কেমনে দিমু, কী খাইমু– হেয় চিন্তায় রাইতে ঘুম হয় না। বাকি ক্ষেত পানির তলে। কাটতে গেলে দ্বিগুণ টেহা লাগবো। যে ধান পাইমু তা পচা, বেচলে বাড়িত আনার খরচের টেহা হইতো না। আশপাশের ধানের খলায়, এমন অসংখ্য ধানের স্তূপে গ্যাজ দেখা গেছে।’ 
এই তিন হাওরে কৃষকদের দাবি অনুযায়ী বর্তমানে ৪০ ভাগ ধানি জমি পানিতে তলিয়ে আছে। যেসব ধান কাটা হয়েছে এর মধ্যে অর্ধেক ধান পচে গ্যাজ আসছে। এগুলো কোন কাজে আসবে না। দুই দিন ধরে রোদ উঠলেও কিছু কিছু কৃষক উঁচু জায়গায় ধান রোদে শুকাচ্ছে। তবে অধিকাংশ ধান থেকে পচা গন্ধ বেরোচ্ছে। 
এদিকে হাওরে গোখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। কারণ, পচা ধানের খড় গরু, মহিষ খাচ্ছে না। হাওরের পতিত জমিতে পানি উঠেছে। গরু-মহিষের ঘাস খাওয়ার কোনো জায়গা নেই। সামনে কোরবানি ঈদ। অনেক কৃষক গরু বিক্রি করে মহাজনের ঋণ ও সমিতির ঋণ শোধ করবেন বলে জানিয়েছন। 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওবায়দুল ইসলাম অপু জানান, উপজেলায় প্রায় চার হাজার ৮০০ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ধান কাটা হয়েছে ৭৫ শতাংশ। কিন্তু কৃষকের তথ্যের সঙ্গে সরকারি তথ্যের কিছু অমিল রয়েছে। কৃষকদের দাবি. এখনও ৪০ ভাগ ধান পানিতে তলিয়ে আছে। এর মধ্যে ১০ শতাংশ কাটা ধানে চারা গজিয়েছে। 

আরও পড়ুন

×