ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

‘হাম আমার ৯ মাসের ফেরেশতা বাচ্চাডার জীবন কাইড়া নিলো’

‘হাম আমার ৯ মাসের ফেরেশতা বাচ্চাডার জীবন কাইড়া নিলো’
×

ছবি: সমকাল

তানভীর হোসাইন, ময়মনসিংহ

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ১৯:৫২ | আপডেট: ১০ মে ২০২৬ | ২০:৪৯

“হাম আমার বুকের মানিকরে কাইরা নিলো। আমার পোলাডা বাপ পাগল আছিল। তার বাপ বাজার থেইক্কা যহন রাইতে মাছ বেইচ্চা বাড়িত আইতো তহন হে তার বাপরে ছাড়া কিছুই বুঝতো না। তার বাপেরে ধইরা ঘুমাইতো। অহন আমার মানিক সোনা তো মাডির তলে একলা একলা ঘুমাইতাছে। আমার পোলাডা এহন কার লগে ঘুমাইবো? হাম আমার ৯ মাসের ফেরেশতা বাচ্চাডার জীবন কাইড়া নিলো।” 

এভাবেই বিলাপ করছিলেন মারা যাওয়া শিশু হোসাইনের মা রিপা আক্তার। গত ৬ মে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে তার ৯ মাস বয়সী শিশু হোসাইন আলী। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার নামাপাড়া গ্রামের দরিদ্র মাছ বিক্রেতা আরিফ হোসেন ও গৃহিণী রিপা আক্তারের ছোট ছেলে ছিল হোসাইন। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে একটি ফুটফুটে শিশুর হাসি কীভাবে মরণঘাতী হামের কবলে পড়ে নিভে গেল সেটি ভেবেই বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়েন তার মা।  

অসুস্থতার শুরু এবং গ্রাম্য চিকিৎসা:

হোসাইনের অসুস্থতার সূত্রপাত গত ফেব্রুয়ারি মাসে। সামান্য ডায়রিয়া দিয়ে শুরু হওয়া এই শারীরিক জটিলতা যে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর দুয়ারে নিয়ে যাবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি তার বাবা-মা। তারা প্রথমে স্থানীয় ওষুধের ফার্মেসি থেকে ওষুধ খাওয়ান। কিন্তু তাতে কাজ না হওয়ায় শরণাপন্ন হন কবিরাজের। ঝাড়ফুঁক আর তুকতাক চলল বেশ কিছুদিন। কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হলো না।

যখন অবস্থার অবনতি চরমে পৌঁছাল, তখন তাকে ময়মনসিংহ সদরের চুরখাই এলাকার কমিউনিটি বেইজড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে কয়েক দিনের চিকিৎসায় শিশুটি কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে। কিন্তু ভাগ্য হয়তো অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।

ঢাকা ও ময়মনসিংহে হাসপাতালের দুয়ারে দুয়ারে:

মার্চের প্রথম সপ্তাহে আবারও জ্বর, ঠান্ডা ও কাশি নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে হোসাইন। পুনরায় তাকে চুরখাইয়ের সেই বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু এবার আর সাধারণ চিকিৎসায় কাজ হচ্ছিল না। চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। এক বুক আশা নিয়ে আরিফ ও রিপা তাদের সন্তানকে নিয়ে পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়।

এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘোরার পর নিরুপায় হয়ে তারা একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করান হোসাইনকে। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে বাচ্চার শ্বাসকষ্ট তীব্র আকার ধারণ করলে চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান, শিশুটি হামে আক্রান্ত। তাকে দ্রুত এনআইসিইউ-তে ভর্তির পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালের আকাশচুম্বী খরচ মেটানোর সামর্থ্য ছিল না মাছবিক্রেতা আরিফের। একদিকে অর্থাভাব, অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালে সিট না পাওয়া—সব মিলিয়ে বাধ্য হয়ে তারা ফিরে আসেন ময়মনসিংহে।

শেষ মুহূর্তের লড়াই ও স্বজনদের অভিযোগ:

ময়মনসিংহে ফিরে আসার পর হোসাইনকে কয়েক দিন তার নানার বাড়ি ত্রিশালে রাখা হয়। সেখানে স্থানীয় কিছু চিকিৎসা চললেও অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। গত ২ মে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রথমে তাকে ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে রাখা হলেও পরে স্থানান্তর করা হয় ৮ তলায় অবস্থিত বিশেষ ‘হাম কর্নারে’।

হোসাইনের নানি হোসনা আক্তারের অভিযোগ, “যখন আমার নাতিরে ৮ তলায় হাম কর্নারে নিয়া যাওয়া হইতাছিল, তখন তার খুব শ্বাসকষ্ট আছিল। কিন্তু ডাক্তাররা তারে কোনো অক্সিজেন ছাড়াই নিয়া গেছে। ওই সময়টুকুতে বাচ্চাটা আরও নীল হইয়া গেছিল। ঠিকমতো অক্সিজেন পাইলে হয়তো আমার মানিকটা আজ বাইচ্চা থাকত।” হাসপাতালে চারদিন লড়াই করার পর ৬ মে সকালে চিরদিনের জন্য চোখ বোজে ৯ মাসের শিশু হোসাইন।

পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ:

হোসাইনের বাবা আরিফ হোসেন ফুলবাড়িয়ার স্থানীয় একটি বাজারে মাছ বিক্রি করে সংসার চালান। বড় ছেলে বায়োজিদ হোসাইনের বয়স মাত্র ৩ বছর। আরিফ বলেন, “আমি কাজ শেষে বাড়ি ফিরলে হোসাইন আমার কোল থেকে নামতে চাইত না। মাকেও ভুলে যেত তখন। আমার সেই বাপ-পাগল বাচ্চাটা আজ মাটির নিচে একলা ঘুমাচ্ছে। আমি কার জন্য কামাই করব? কার মুখ দেখে বাড়িতে ফিরব?”

আরিফ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কেন হামের টিকা সময়মতো দেওয়া সম্ভব হলো না? তিনি বলেন, “টিকা যদি সময়মতো পাইত, তবে হয়তো আমার বাচ্চার এই দশা হইতো না। অন্য আক্রান্ত বাচ্চার থেকেই আমার বাচ্চা রোগটা পাইছে।”

হোসাইনের খালা হাদিয়া বেগম জানান, ৬ মাস পর্যন্ত শিশুটি শুধু মায়ের দুধ খেত। এরপর তাকে খুব আদর করে চালের গুঁড়া, মিষ্টি আলু আর ভাত খাওয়ানো হতো। পরিবারের সবার মধ্যমণি ছিল এই ছোট্ট শিশুটি। আজ সেই বাড়িতে কান্নার রোল থামছে না।

মমেক হাসপাতালের হাম ইউনিটের চিত্র :

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের প্রাদুর্ভাব এখন আশঙ্কাজনক পর্যায়ে। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, গত দেড় মাসে হাম ইউনিটে ১ হাজার ২২০ জন শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৯২ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও হোসাইনের মতো ২৭ জন শিশু না ফেরার দেশে চলে গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩০ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং বর্তমানে কয়েকশ শিশু সেখানে চিকিৎসাধীন। 

ডা. মাইনউদ্দিন আরও জানান, হামের এমন ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব এবং রোগীর এতো চাপ তাদের কল্পনার বাইরে ছিল। ওষুধ এবং জনবলের সংকটের কারণে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। সে কারণে স্বজনদের মনে কিছু ক্ষোভ থাকলেও চিকিৎসকরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন বলে তিনি দাবি করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও দুর্গম এলাকা বা সচেতনতার অভাবে অনেক শিশু এর বাইরে থেকে যাচ্ছে। যার ফলে মাঝে মাঝেই এমন মহামারি আকারে হামের সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে।

ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জের বিপুল সংখ্যক শিশু এখন এই মরণব্যাধির সঙ্গে লড়াই করছে। হোসাইন চলে গেছে, রেখে গেছে এক বুক হাহাকার। কিন্তু হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা অন্য শিশুদের বাবা-মায়ের চোখে এখন একটাই প্রার্থনা—তাদের সন্তানদের যেন হোসাইনের মতো পরিণতি না হয়।

সরকার এবং স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, হামের এই প্রাদুর্ভাব রুখতে যেন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং টিকাদান কর্মসূচিকে আরও তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়। হোসাইনের মায়ের সেই বিলাপ যেন আর কোনো মায়ের কণ্ঠে ধ্বনিত না হয়, সেই দায়িত্ব এখন রাষ্ট্রের। 

আরও পড়ুন

×