ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

ময়মনসিংহ মেডিকেলে দেড় মাসে ২৭ শিশুর মৃত্যু

‘হাম আমার বুকের মানিকরে কাইড়া নিল’

‘হাম আমার বুকের মানিকরে কাইড়া নিল’
×

ছবি: ফাইল

 নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ০৬:৫৯

‘হাম আমার বুকের মানিকরে কাইড়া নিল। পোলাডা বাপপাগল আছিল। হে তার বাপের কোল থাইক্যা নামত না। বাপেরে ধইরা ঘুমাইত। অহন মানিক সোনা তো মাডির তলে একলা একলা ঘুমাইতাছে। আমরা বুকটা পুইড়্যা যাইতাছে।’ বিলাপ করতে করতে এসব কথা বলেন আর চোখ মুছতে থাকেন হোসাইন আলী নামের এক শিশুর মা। ৯ মাসের হোসাইন গত ৬ মে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

হোসাইন ছিল ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার নামাপাড়া গ্রামের মাছ বিক্রেতা আরিফ হোসেন ও গৃহিণী রিপা আক্তারের ছোট ছেলে।  

হোসাইন অসুস্থ হয় গত ফেব্রুয়ারি মাসে। সামান্য পাতলা পায়খানা দিয়ে শুরু হলেও শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে ময়মনসিংহ সদরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে কয়েক দিনের চিকিৎসায় শিশুটি কিছুটা সুস্থ হয়। পরে তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়।  

কিন্তু মার্চের প্রথম সপ্তাহে আবারও জ্বর, ঠান্ডা ও কাশিতে ভোগে হোসাইন। আবার তাকে সেই বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু এবার চিকিৎসক তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। হোসাইনকে নিয়ে তার মা-বাবা ঢাকায় যান। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে সিট পাননি। তাই একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করান। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে হোসাইনের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসক জানান, সে হামে আক্রান্ত। তাকে দ্রুত এনআইসিইউতে ভর্তির পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু খরচ মেটানোর সামর্থ্য না থাকায় হোসাইনকে নিয়ে তারা ফিরে আসেন ময়মনসিংহে।

এরপর অবস্থার অবনতি হলে ২ মে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রথমে তাকে ওয়ার্ডে রাখা হলেও পরে বিশেষ হাম কর্নারে পাঠানো হয়। পরে ৬ মে তার মৃত্যু হয়।

হোসাইনের নানি হোসনা আক্তারের অভিযোগ, ‘যখন আমার নাতিরে হাম কর্নারে নিয়া যাওয়া হইতাছিল, তখন তার খুব শ্বাসকষ্ট আছিল। তারে কোনো অক্সিজেন ছাড়াই নিয়া গেছে। ওই সময় বাচ্চাটা আরও নীল হইয়া গেছিল। ঠিকমতো অক্সিজেন পাইলে হয়তো সে আজ বাইচ্চা থাকত।’

হোসাইনের বাবা আরিফ হোসেন ফুলবাড়িয়ার স্থানীয় একটি বাজারে মাছ বিক্রি করে সংসার চালান। বড় ছেলে বায়েজিদ হোসাইনের বয়স মাত্র তিন বছর। আরিফ বলেন, ‘চোখের সামনে ছেলের এমন মৃত্যু মানা যায় না। টিকা যদি সময়মতো পাইত, আমার বাচ্চাটার এই দশা হইত না।’

মমেক হাসপাতালের হাম ইউনিটের চিত্র

মমেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানান, গত দেড় মাসে হাম ইউনিটে ১ হাজার ২২০টি শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৯২ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। তবে হোসাইনের মতো ২৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে কয়েকশ শিশু চিকিৎসাধীন।

ডা. মাইনউদ্দিন আরও জানান, হামের এমন ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব এবং রোগীর এত চাপ তাদের কল্পনার বাইরে ছিল। ওষুধ ও জনবলের সংকটে  আক্রান্ত শিশুদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। চিকিৎসকরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন।

আরও পড়ুন

×