কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে ফসলহানি
ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় ওঠেনি অনেক কৃষকের নাম
ইটনার রায়টুটি এলাকায় ধনু নদীর তীরে ধান ও খড় শুকাতে ব্যস্ত কৃষকরা। ছবি: সমকাল
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ০৭:০৪
বোরো ফসলহানির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দেবে সরকার। কিশোরগঞ্জ কৃষি বিভাগ ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও জমির পরিমাণ নির্ণয় করে প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছে। কিন্তু এই তালিকা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষকের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। সব ধান হারিয়েও অনেকেই তালিকাভুক্ত হতে পারেননি। আবার যে পরিমাণ জমি ক্ষতিগ্রস্ত দেখানো হয়েছে ক্ষতি হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি। গত শনিবার ইটনা উপজেলার বাদলা ইউনিয়নের কুর্শি গ্রামে গেলে বেশ কয়েকজন কৃষক এমন অভিযোগ করেন।
কুর্শি গ্রামের হযরত আলীর ছয় বিঘা জমির মধ্যে চার বিঘাই তলিয়ে গেছে। জসিম উদ্দিনের ৫০ শতাংশের মধ্যে ৩০ শতাংশ ও শাহীন মিয়ার এক একর ৩০ শতাংশের মধ্যে এক একরই ডুবে গেছে। আলাল মিয়ার ৭০ শতাংশ জমির মধ্যে মাত্র ১৫ শতাংশের ধান কাটতে পেরেছেন। তমিজ উদ্দিনের ডুবে গেছে এক একর, কেটেছেন ৫০ শতাংশ। বকুল মিয়ার দুই একরের মধ্যে এক একর ২০ শতাংশই ডুবে গেছে। অথচ তাদের নাম ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় নেই। তারা জানান, সপ্তাহখানেক আগে কৃষি বিভাগের এক কর্মকর্তা এসে কয়েকজনের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেন।
খবর পেয়ে তারা যেতে যেতেই ওই কর্মকর্তা চলে যান। তাঁর পরিচয়ও কৃষকরা জানতে পারেননি। কৃষকদের অভিযোগ, যাদের মামা-ফুপা আছে, তাদের মুখ দেখে দেখে তালিকা করা হয়েছে।
থানেশ্বর গ্রামের কৃষক সোয়াদ মিয়া ও আবুল কাশেম ভূঁইয়া জানিয়েছেন, তাদের এলাকায় কয়েকটি হাওরের অনেক জমি তলিয়ে গেছে। কৃষকরা ধান কাটতে পারেননি। বাদলা ইউনিয়নে প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। ইটনা উপজেলার ৯টি ইউনিয়নেই কমবেশি এ রকম ক্ষতি হয়েছে। অথচ কৃষি বিভাগ পুরো উপজেলায় মাত্র তিন হাজার ২৬১ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দেখিয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ কম দেখানোর ধারাবাহিকতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যাও কম দেখানো হয়েছে বলে কৃষকদের অভিযোগ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারসহ ইউনিয়ন ত্রাণ কমিটির সহায়তায় তালিকা করেছেন। এর পরও যদি ক্ষতিগ্রস্ত কেউ বাদ পড়ে থাকে, তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারে। জমির হিসাবের গরমিলের অভিযোগ সম্পর্কে উপপরিচালক বলেন, যাচাই করেই জমির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সরকারের সহায়তাপ্রাপ্তির তালিকায় নাম উঠবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষকের। ইতোমধ্যে তৈরি করা তালিকায় স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে অনেক এলাকায়।
সদর উপজেলার জলিলপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল মুকিত জানান, তিনি সাত একর ২৮ শতাংশ জমি চাষ করেছিলেন; পানির নিচে গেছে পাঁচ একর ২৮ শতাংশ। এর মধ্যে আধাপাকা ছিল; পাকা ধানও ছিল। তিনি বলেন, যাদের ক্ষতি হয়েছে, তারা এখনও ধান শুকাচ্ছেন। তালিকার পেছনে এসব কৃষক দৌড়াচ্ছেন কম। যারা তালিকার পেছনে দৌড়াচ্ছেন, তাদের কেউ কেউ চাষাবাদই করেন না। শুনেছেন, স্থানীয় মেম্বারের লোকজন ক্ষতিগ্রস্তদের ভোটার আইডি কার্ড নিচ্ছেন। তাঁর আইডি কার্ড এখনও কেউ নেয়নি।
আব্দুল মুকিত জমি চাষ করেন নাইন্দা, হাওয়াকই ও বড় উইকলা হাওরে। এই ছোট ছোট তিন হাওরে চাষাবাদ করা বেশির ভাগ কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত। একটু দূরে দাঁড়ানো কৃষক শফিক মিয়া বললেন, হাওরে কমবেশি ক্ষতি হয়েছে সবারই। কিন্তু আইডি কার্ড নেওয়া হয়েছে নেতাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আছে যাদের, কেবল তাদের।
লক্ষ্মণশ্রী ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন তালুকদার বলেন, দুদিন সময় দিয়ে ক্ষতিগ্রস্তের তালিকা করতে বলা হয়েছিল। এ জন্য কিছু ভুলত্রুটি হতে পারে।
তালিকায় ত্রুটি থাকার কথা জানিয়ে শান্তিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাগর খান বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত নয় এমন অনেকের নাম ঢুকেছে তালিকায়। আবার ক্ষতি হয়েছে এমন অনেকের নাম বাদ পড়েছে। এ অবস্থায় রোববার উপজেলা পরিষদে বসে সিদ্ধান্ত হয়েছে– প্রতিট ইউনিয়নে পাঁচ সদস্যের কমিটি দ্রুত তালিকা যাচাই-বাছাই করবে।
জেলা প্রশাসক মিনহাজুর রহমান বলেন, স্থানীয় প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ এবং কৃষি বিভাগকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করতে বলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কোনো কৃষকের নাম তালিকায় না উঠলে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে অবহিত করলে তাঁর নাম তালিকায় তুলে দেওয়া হবে।
রক্ষা পেল ছায়ার হাওর
সুনামগঞ্জের ছায়ার হাওর ও উদগল হাওরের মাঝখানে জয়পুর বাঁধ শনিবার গভীর রাতে কে বা কারা কেটে দেয়। এতে ঝুঁকিতে পড়ে বিশাল ছায়ার হাওরের বোরো ধান। জলাবদ্ধতায় ডুবে থাকা উদগল হাওরের পানি নামতে থাকে ছায়ার হাওরে। সকালে কৃষকরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানালে তিনি স্থানীয় কৃষকদের সহায়তায় কাটা অংশ বন্ধ করে দেন।
- বিষয় :
- কিশোরগঞ্জ
