ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

ব্রাহ্মণকান্দা আব্দুল শরীফ একাডেমি

এসএসসির প্রশ্নপত্র সংকটে বিদ্যালয়ের অনিয়ম ফাঁস

এসএসসির প্রশ্নপত্র সংকটে বিদ্যালয়ের অনিয়ম ফাঁস
×

সাইফুল ইসলাম শাকিল, ভাঙ্গা (ফরিদপুর)

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ০৭:১০

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার ব্রাহ্মণকান্দা আব্দুল শরীফ একাডেমির প্রধান শিক্ষকসহ কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে এসএসসি পরীক্ষায় অযোগ্য ও অনিয়মিত ২১ শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ করিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে পরীক্ষা শুরুর পরপরই প্রশ্নপত্র সংকট তৈরি হয়ে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিমশিম খেতে হয়। গত ৬ মে বিষয়টি জানাজানি হলে উপজেলাজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভাঙ্গার পুখুরিয়া এলাকার ব্রাহ্মণকান্দা আব্দুল শরীফ একাডেমিতে নিয়মিত এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন ৩৯ জন। পরে বিশেষ তদবিরে দুই থেকে চার বিষয়ে ফেল করা আরও ২৮ শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এর বাইরে পরীক্ষার মাত্র তিনদিন আগে আরও ২১ জন অনিয়মিত ও অযোগ্য শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।

এ ঘটনায় অভিযুক্ত করা হয়েছে প্রধান শিক্ষক এনামুল কবির, সহকারী প্রধান শিক্ষক গোলাম কবির, কম্পিউটার শিক্ষক মো. শাহ আলম এবং বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য সাজিদ মাহমুদ সজিব তালুকদার। ইতোমধ্যে কয়েকজন অভিভাবক মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক ও অভিভাবক জানান, পরীক্ষার শুরুতেই ইসলাম ধর্ম, পৌরনীতি ও গার্হস্থ্য বিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্র ২১টি করে কম পড়ে। পরে অতিরিক্ত প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বেগ পেতে হয়। এতে পরীক্ষার্থীদের নির্ধারিত সময়ের পর প্রশ্নপত্র দেওয়া হয় এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।

ভাঙ্গা কাজী সামচুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও হল সুপার অরুন দত্ত চন্দ্র বলেন, ‘আমাদের কেন্দ্রে ব্রাহ্মণকান্দা আব্দুল শরীফ একাডেমির ৮৮ জন শিক্ষার্থী ছিল। পরীক্ষার প্রথম দিনই কয়েকজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জানতে পারি, তারা দুই দিন আগে ফরম ফিলাপ করেছে। পরে অনলাইনে যাচাই করে প্রশ্নপত্র স্বল্পতার বিষয়টি বুঝতে পারি এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককে জানাই। পরে সমস্যার সমাধান হয়।’

অভিভাবকদের অভিযোগ, ২১ শিক্ষার্থীর ফরম পূরণের নামে ৮ লাখ টাকারও বেশি হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা বিদ্যালয়ের তহবিলে জমা হলেও বাকি টাকা সংশ্লিষ্টরা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক এনামুল কবির বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় নিয়মিত স্কুলে যেতে পারিনি। আমি ৬৭ জন পরীক্ষার্থীর ফরম পূরণ করেছি। কিন্তু বাকি ২১ জনের ফরম কে বা কারা পূরণ করেছে, তা জানি না। আমার পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে এসব করা হয়েছে। এ বিষয়ে কথা বলায় আমাকে হুমকিও দেওয়া হয়েছে।’

তবে সহকারী প্রধান শিক্ষক গোলাম কবির প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য নাকচ করে বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়েই ২১ শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ করা হয়েছে। ফরম পূরণের টাকা বিদ্যালয়ের ফান্ডে জমা দেওয়া হয়েছে। কোচিং ফি বাবদ চার হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে, যা কয়েকজন শিক্ষক ভাগ করে নিয়েছি।’

বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য সাজিদ মাহমুদ সজিব তালুকদার বলেন, ‘এলাকার কয়েকজন অভিভাবকের অনুরোধে আমি সুপারিশ করেছি। এক রাজনৈতিক নেতার সুপারিশে বহিরাগত একজন পরীক্ষার্থীও নেওয়া হয়েছে। তবে টাকা-পয়সার বিষয়টি শিক্ষকেরাই জানেন।’

এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) ইকবাল হোসেন বলেন, ‘২১ শিক্ষার্থীর ফরম পূরণের অভিযোগ সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে ভাঙ্গা ও নগরকান্দায় মোট ১০২ জন শিক্ষার্থীর পরীক্ষা শুরুর আগের দিন ফরম পূরণ হওয়ায় সাময়িক সমস্যা হয়েছিল। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ভাঙ্গার সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আবু জাহের বলেন, ‘প্রশ্নপত্র স্বল্পতার বিষয়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমাকে অবগত করেছিল। পরে বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী ট্রেজারির মাধ্যমে অতিরিক্ত প্রশ্নপত্র আনার ব্যবস্থা করা হয়।’

সদ্য যোগদান করা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে এখনই বিস্তারিত জানলাম। তদন্ত করে অনিয়ম ও দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আরও পড়ুন

×