ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

চলনবিলে ‘ঢলন’ প্রথায় বাড়তি চাপ হাসি নেই কৃষকের

চলনবিলে ‘ঢলন’ প্রথায় বাড়তি চাপ হাসি নেই কৃষকের
×

সিরাজগঞ্জের তাড়াশের খুটিগাছা মহল্লায় ঢলন প্রথায় চলছে ধান কেনা-বেচা সমকাল

তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ০৭:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

খাদ্যশস্য ভান্ডারখ্যাত চলনবিলাঞ্চলে এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও মুখে হাসি নেই কৃষকের। ধানের দাম কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ‘ঢলন’ নামে অতিরিক্ত ওজন নেওয়ার প্রথায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সিরাজগঞ্জের তাড়াশসহ চলনবিল এলাকার হাজার হাজার কৃষক।

তাড়াশ উপজেলার কৃষক আব্দুর রাজ্জাক প্রতিবছরের মতো এবারও প্রায় ১৯ বিঘা জমিতে বিভিন্ন জাতের বোরো ধানের আবাদ করেছেন। ধান কাটা ও মাড়াই শেষে বাড়ির উঠান থেকেই তিনি ধান বিক্রি করছেন। কিন্তু বাজারে দাম এতটাই কম যে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে। তিনি বলেন, ‘সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক ও মাড়াই খরচ মিলিয়ে এবার ধান উৎপাদনে গত বছরের চেয়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি খরচ হয়েছে। অথচ এখন মিনিকেট ধান বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র এক হাজার টাকা মণ দরে। এর ওপর ঢলন প্রথায় বাড়তি ধান দিতে হচ্ছে।’

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্যমতে, ঢলন প্রথা হলো ফসল কেনাবেচায় প্রচলিত ও বিতর্কিত ওজনের নিয়ম, যেখানে মণের হিসাবে ৪০ কেজির পরিবর্তে কৃষকদের কাছ থেকে ৪২ থেকে ৪৩ কেজি বা তারও বেশি ফসল নিয়ে ১ মণ ধরা হয়। অর্থাৎ নির্ধারিত ওজনের চেয়ে অতিরিক্ত ধান নেওয়া। এ নিয়মে প্রতি মণেই ২ থেকে ৩ কেজি ধান বেশি দিতে বাধ্য হচ্ছেন চলনবিলের কৃষকরা।
চলনবিলের গুল্টা, বিনসাড়া, নওগাঁ, গুড়পিপুল, নিমগাছী, সলঙ্গা, বামিহাল, রনবাঘা, চাচকৈড়, মির্জাপুর, হান্ডিয়াল, বোয়ালিয়া ও ধরইলসহ অন্তত ৩০ থেকে ৩৫টি ধানের হাট ঘুরে জানা গেছে, বর্তমানে শুকনা মিনিকেট ধান বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫০ টাকা, ভেজা ধান এক হাজার টাকা, কাটারিভোগ শুকনা এক হাজার ২০০ টাকা এবং ভেজা এক হাজার ১০০ টাকা মণ দরে। ব্রি-২৯ ধানও বিক্রি হচ্ছে তুলনামূলক কম দামে।

তাড়াশের কোহিত গ্রামের কৃষক মো. লুৎফর রহমান বলেন, ‘হাটে ৪২ কেজি আর বাড়ির উঠানে ৪৩ কেজি ধরে এক মণ ধান নেওয়া হচ্ছে। বাড়তি ধান না দিলে মহাজনরা কিনতেই চায় না। এটা এখন অঘোষিত নিয়ম হয়ে গেছে।’ সিংড়ার বিয়াস গ্রামের কৃষক ইমরান হোসেন বলেন, ‘পাঁচ-ছয় বছর ধরে এই প্রথা চলছে। প্রচলিত ওজন ব্যবস্থা উপেক্ষা করে কৃষকদের ঠকানো হচ্ছে। প্রতিকার মিলছে না।’
সেরাজপুর গ্রামের কৃষক বাবলু জানান, এক বিঘা জমিতে ধান উৎপাদনে ২১ হাজার টাকা খরচ হয়। ভালো ফলন হলেও বাজারদর কম থাকায় লাভ দূরের কথা, খরচ তুলতেই কষ্ট হচ্ছে। তার ওপর ঢলনের বাড়তি চাপ ‘বোঝার ওপর শাকের আঁটি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ধান ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেনের দাবি, ভেজা ধান ও বস্তার ওজন সমন্বয় করতেই কিছুটা বাড়তি ধান নেওয়া হয়। যদিও বড় মহাজনদের কাছে ৪০ কেজিতেই ধান বিক্রি করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা বলেন, ‘ঢলন প্রথার বিষয়টি জানা ছিল না। কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কিনা, তা দেখা হবে।’

আরও পড়ুন

×