অতিবৃষ্টিতে সর্বনাশ সবজিক্ষেতের
ক্ষেতে মরে যাওয়া বেগুন গাছ স্ত্রী শাহানা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে উপড়ে ফেলার কাজ করছেন কৃষক বাচ্চু মিয়া। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মুসলিমপুর গ্রাম সমকাল
পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ০৭:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ক্ষতির পাশাপশি মৌসুমি সবজিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ কারণে বাজারে সবজির দামও বেড়ে গেছে। বিশেষ করে বেগুন, কাঁচামরিচ, বরবটি, শসা, চিচিঙ্গা, করলা, ঝিঙ্গা, ঢ্যাঁড়শ, চালকুমড়া এবং পুঁইশাকসহ সব ধরনের শাকের দাম বেড়ে গেছে। বাজারে প্রতিকেজি ৬০ থেকে ৮০ টাকার নিচে কোনো সবজি পাওয়া যাচ্ছে না।
অতিবৃষ্টির পর কড়া রোদেও কিছু সবজির গাছ নুয়ে পড়েছে। সবুজ থেকে লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। জমিতে পানি লেগে গোঁড়া পচন ধরেছে। কৃষি বিভাগ অবশ্য বলেছে, সবজির ক্ষয়ক্ষতির তেমন তথ্য তাদের কাছে নেই। চাষিদের এই সংকট কাটাতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের মুসলিমপুর গ্রামের কৃষক বাচ্চু মিয়া। মঙ্গলবার বিকেলে স্ত্রী শাহানা বেগমকে নিয়ে গ্রামের পাশের জমিতে অতিবৃষ্টিতে মরে যাওয়া বেগুন গাছ উপড়ে ফেলার কাজ করছিলেন। এগুলো তুলে ফেলছেন কেন, জানতে চাইলে বললেন, অতিবৃষ্টিতে জমিতে পানি লেগে গোঁড়ায় পচন ধরেছে। পরে কড়া রোদ দেওয়ায় লাল হয়ে মরে গেছে। বাচ্চু জানালেন, তিনি ৩০ শতাংশ জমিতে বেগুন, ৩০ শতাংশে উচ্ছে, ৩৮ শতাংশে ঢ্যাঁড়শ আবাদ করেছিলেন। চাষবাস করতে গিয়ে দেড় লাখ টাকা ঋণ করেছেন সবজি বাজারের দুজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। এখন বাজারে গেলেই তারা টাকার জন্য তাগাদা দিচ্ছেন।
বাচ্চু মিয়ার পাঁচ ছেলেমেয়ে। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। অন্য মেয়েটি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। ছেলেরা প্রাইমারি স্কুলে পড়ছে। বৃষ্টিতে নষ্ট না হলে কমপক্ষে তিন লাখ টাকার সবজি এই মৌসুমে বিক্রয় করতে পারতেন বলে জানালেন বাচ্চু মিয়ার স্ত্রী শাহানা বেগম।
শাহানা বললেন, ‘বাজারে এবার সবজির দাম বেশি ছিল, কত স্বপ্ন দেখেছিলাম। ফলন ধরার শুরুতেই শিল এবং বৃষ্টিতে সব নষ্ট হয়েছে।’
মুসলিমপুরের কৃষক রফিক মিয়াও একইভাবে কাঁচামরিচ, বেগুন ও বরবটি চাষ করে বিপদে পড়েছেন। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নের মাঝেরটেক গ্রামের কৃষক করম আলী কষ্টের বর্ণনা দিয়ে বলছিলেন, ২১ শতাংশ জমিতে কাঁচামরিচ এবং ৪৫ শতাংশ জমিতে বরবটি করেছিলেন। খরচ করেছেন ৫০ হাজার টাকা। মরিচ কেবল গাছ থেকে বের হচ্ছিল। বরবটিও কেবল ফলতে শুরু হয়েছিল। এরমধ্যেই লাগাতার বৃষ্টি এবং শিলা পাথরে সর্বনাশ ঘটেছে।
করম আলী বললেন, আর কয়েকদিন সময় পেলে কমপক্ষে আড়াই লাখ টাকার মরিচ-বরবটি বিক্রয় করতে পারতেন। এখন সময় নষ্ট না করে বরবটি ও মরিচের মরা গাছ উপড়ে ফেলে ৯২ জাতের ধান বপনের জন্য জমি তৈরি করছেন।
বাদেরটেক এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সবজিক্ষেত দেখতে আসা বেসরকারি একটি বীজ কোম্পানির প্রতিনিধি ধনঞ্জয় তালুকদার বললেন, খরিফ মৌসুমের সবজির বীজ বপন শুরু হয় ফেব্রুয়ারি মাসে, এপ্রিল মাস পর্যন্ত বপন চলে। আগাম যারা করেন তাদের ক্ষতি হয়েছে বেশি। ফলসহ গাছ মরে গেছে অতিবৃষ্টিতে। শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে। বৃষ্টির পর কড়া রোদে লতাজাতীয় সবজির গাছ ঢলে পড়েছে, মারাও গেছে। তিনি জানালেন, অনেকের টমেটো এবং মুলাও ছিল জমিতে, এগুলো পচে নষ্ট হয়েছে। এখন বাজারে গেলে লোকাল মুলা-টমেটো পাওয়া যায় না।
বীজ দোকানিরাও একই ধরনের হতাশার কথা জানালেন। সুনামগঞ্জ শহরের স্টেশন রোডের মসজিদ মার্কেটের রুমানা বীজ ভান্ডারের মালিক মোহাম্মদ রমজান আলী বললেন, অন্যান্য বছরে এই মৌসুমে প্রতিদিন পাঁচ থেকে আট হাজার টাকার বীজ বিক্রয় করেছেন। এবার আগাম বৃষ্টির কারণে বিক্রি নেমে এসেছে মাত্র এক থেকে দেড় হাজার টাকায়।
বাজারে দাম চড়া
সুনামগঞ্জ শহরের কিচেন মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, ১৫ দিনের ব্যবধানে দ্বিগুণ বেড়েছে সবজির দাম। পৌর কিচেন মার্কেটের সবজি ব্যবসায়ী সাদিকুর রহমান সাদিক বললেন, ‘লোকাল (স্থানীয়) সবজি ১৫ দিন আগেও সস্তা ছিল। এখন সুনামগঞ্জের বাইরে থেকে আসায় দাম চড়া। তিনি জানালেন, ১৫ দিনে আগে প্রতিকেজি টেমেটো ছিল ২০ টাকা, এখন টমেটো ৮০ টাকা, বরবটি কেজি ছিল ২০-২৫ টাকা, এখন ৫০-৬০ টাকা। সকল সবজিরই দাম বেড়েছে। অপর সবজি ব্যবসায়ী রাসেল জানান, স্থানীয় সবজি নষ্ট হওয়ায় মুলা, বেগুন, টমেটো, চিচিঙ্গা, শসাসহ সব ধরনের সবজি প্রতিকেজি ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। একই ধরনের মন্তব্য করেন ব্যবসায়ী বরুণ, নূর হোসেন ও নূর আলী।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন বলেন, অতিবৃষ্টিতে বেগুন-কাঁচামরিচসহ কিছু সবজির গাছে গোঁড়া পচন দেখা দিয়েছিল। কৃষকদের ক্ষেত থেকে পানি বের করে দিয়ে বালাইনাশক স্প্রে করার জন্য বলা হয়েছে। তিনি জানান, সুনামগঞ্জে এবার দুই হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে খরিফ মৌসুমের সবজি হয়েছে। তবে বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে সবজি চাষিদের ক্ষতির কোনো তথ্য কৃষি অফিসে এখনও আসেনি।
- বিষয় :
- কৃষি
