ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ফেনীর সোনাগাজী

রোজগারে টান, ধারদেনায় সংসার

রোজগারে টান, ধারদেনায় সংসার
×

মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞার অবসরে নৌকা ও জাল মেরামতে ব্যস্ত জেলেরা। সোমবার সোনাগাজীর চর খোন্দকার জেলেপাড়ায় সমকাল

সোনাগাজী (ফেনী) সংবাদদাতা

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ০৭:৫৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

সামুদ্রিক মাছের প্রজনন নিরাপদ করতে সাগর ও উপকূলীয় এলাকার নদীতে মাছ শিকারে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। গত ১৫ এপ্রিল শুরু হওয়া নিষেধাজ্ঞা চলবে ১১ জুন পর্যন্ত। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় আয় নেই সোনাগাজীর জেলে জগদীশ জলদাসের। সম্প্রতি বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে দুই-আড়াই কেজি মাছ ধরেছেন। সেই মাছ এক হাজার টাকায় বিক্রি করেন উপজেলার চর খোন্দকার জেলেপাড়ার এই বাসিন্দা। ছয় সদস্যের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে। রোজগার-ব্যবসায় টান পড়ায় জগদীশের মতো জেলেরা ঋণ আর ধারদেনায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন।

জগদীশ জলদাসের মতো দুরবস্থায় পড়েছেন উপজেলার অন্য জেলেরাও। স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, সোনাগাজীতে জেলে পরিবারের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। এদের মধ্যে নিবন্ধিত জেলে এক হাজার ৯৯৭ জন। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে তাদের মধ্যে মাত্র ২৭৫ পরিবার সরকারি বরাদ্দের ৮০ কেজি করে চাল পেয়েছে। জগদীশ জলদাসের মতো নিবন্ধিত বাকি এক হাজার ৭২২ জেলে কোনো সহায়তা পাননি। যারা চাল পেয়েছেন, তারাও সন্তুষ্ট নন। এই জেলেরা জানিয়েছেন, পারিবারিক চাহিদার তুলনায় এই চাল খুবই সামান্য।
চর খোন্দকার জেলেপাড়ায় গত সোমবার গিয়ে দেখা যায়, বড় ফেনী নদীর তীরে সারি বেঁধে নোঙর করে আছে মাছ ধরার ট্রলার ও নৌকা। পাশের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছেন জেলেরা। কেউ আবার নৌকা মেরামত করছেন, কেউ ছেঁড়া জাল সেলাই করছেন।

নৌকা মালিক আফছার উদ্দিন বলেন, এমনিতেই দিন দিন নদীতে মাছ কমে যাচ্ছে। এ কারণে জেলে পরিবারগুলো অভাব-অনটনে রয়েছে। টানা ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞায় জেলেদের দুঃখ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। সুনির্দিষ্ট কিছু জেলে যে চাল পেয়েছেন, তা দিয়ে কয়দিন চলবে?
জেলেদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, মা ইলিশ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা ধরায় ৮ মাসের নিষেধাজ্ঞা, এপ্রিল, মে ও জুনের প্রায় দুই মাস অভয়ারণ্যের শিকারে নিষেধাজ্ঞা ও সাগরে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা মিলিয়ে বছরে ১৪০ দিন তাদের নিষেধাজ্ঞা পালন করতে হয়। এমনিতেই ঘূর্ণিঝড়সহ নানা কারণে নদীতে মাছ ধরা পড়ছে কম। ফলে রোজগার-ব্যবসায় টান পড়ায় তারা ঋণ আর ধারদেনায় জর্জরিত।

চর খোন্দকার জেলেপাড়ার বাসিন্দা প্রিয়লাল জলদাসের ভাষ্য, তাদের পাড়া ও উপজেলার দক্ষিণ পূর্ব চর চান্দিয়ায় প্রায় ১৫০টি জেলে পরিবার আছে। নদীতে মাছ ধরেই তাদের সংসার চলে। অন্য কাজ জানা নেই। মাছ ধরা বন্ধ রাখলেও অল্প কিছু জেলে পরিবার ছাড়া অন্যরা সরকারি বরাদ্দ পাননি। এ কারণে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তাদের খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।
পূর্ব চর চান্দিয়ার জেলে জয়নাল আবেদীন বলেন, প্রায় ২৮ দিন ধরে তিনি বেকার। সংসারে স্ত্রী ও চার ছেলেমেয়ে আছে। এখন পর্যন্ত সরকারি সহায়তা পাননি। ট্রলার মালিকরাও কোনো সহযোগিতা করেনি। সংসার চালাতে একটি এনজিও থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছেন।

ইলিশ শিকারি মো. সোহেলের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, উপজেলার চর দরবেশ, চর চান্দিয়া, সদর ও আমিরাবাদ ইউনিয়নে জেলে পরিবারের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। অথচ সরকারিভাবে নিবন্ধিত করা হয়েছে দুই হাজার জেলেকে। মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়ে অল্প কিছু নিবন্ধিত জেলে সরকারি সহায়তা পান। অন্যরা বঞ্চিত হন। এ জন্য তাদের মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে হয়। শিকার নিষিদ্ধ সময়ে সব জেলে পরিবারকে সরকারিভাবে সহায়তা দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
উপজেলা ভারপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা বিজয় কুমার পাল গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় সমকালকে বলেন, সোনাগাজীতে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। তবে সমুদ্রগামী জেলের সংখ্যা কম। এখানকার বেশির ভাগ জেলে নদীতে মাছ ধরেন। এ জন্য মাছ ধরা বন্ধের সময় সবাইকে সহায়তার আওতায় আনা হয় না। তিনি আরও জানান, ২০২২ সাল পর্যন্ত সাড়ে ৩০০ জেলে সহায়তা পেতেন। নানা অভিযোগের পর তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ১০০ 
জেলেকে সহায়তার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ২৫০ জেলে পরিবারের জন্য বরাদ্দ আসে। এবার নতুন করে আরও ২৫ জেলে পরিবারকে সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে এর পরিমাণ বাড়তে পারে।
 

আরও পড়ুন

×