অনিয়ম-দুর্নীতি, ৭ শিক্ষকের বেতন ফেরত চেয়ে চিঠি
আনোয়ার হোসেন মিন্টু, জামালপুর
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৮:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
হাজিরা খাতায় সর্বশেষ স্বাক্ষর করেছিলেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। এরপর এক দিনের জন্যও পা পড়েনি বিদ্যালয়ের আঙিনায়। নিয়োগ বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ, নারী কেলেঙ্কারিসহ নানা অভিযোগ মাথায় নিয়ে এলাকা ছেড়ে বাস করছেন পাশের জেলা শেরপুরে। অভিযুক্ত মোহাম্মদ আলতাফুর রহমান জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার লক্ষ্মীপুর হাজী ফুল মাহমুদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
প্রায় ২১ মাস ধরে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলছেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ে নিয়োগ বাণিজ্য করে অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অডিট রিপোর্টে তাঁর অবৈধ নিয়োগ ও নানা অপকর্ম ধরা পড়ে। ফলে তাঁর উত্তোলিত ৩৯ লাখ ৭৬ হাজার ৮৪৩ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত চেয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি আসে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের আরও ৬ শিক্ষকের উত্তোলন করা বেতন-ভাতার এক কোটি ৩৬ লাখ ৯৮ হাজার ১১২ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত চেয়ে চিঠি পাঠায় অধিদপ্তর।
অডিট রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলতাফুর রহমানের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বাধ্যবাধকতা মানা হয়নি। স্থানীয় পত্রিকায় সীমিত প্রচারের মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে। তাঁর প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও বিএড ডিগ্রি না থাকায় তাঁর আবেদনই বাতিলযোগ্য ছিল। ফলে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াই অবৈধ। যে কারণে তাঁর সরকারি বেতন-ভাতা পাওয়ার সুযোগ নেই। তাই ২০০৪ সালের ১ মে থেকে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাঁর উত্তোলিত ৩৯ লাখ ৭৬ হাজার ৮৪৩ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে বলা হয়েছে।
সহকারী শিক্ষক আ. রহিমের নিয়োগেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তাঁর ক্ষেত্রেও জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। বিধিসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই নিয়োগ সম্পন্ন করায় তিনিও সরকারি বেতন-ভাতা প্রাপ্য হবেন না। ২০০৪ সালের ১ মে থেকে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাঁর উত্তোলিত ৩৪ লাখ ৯৬ হাজার ৩২৮ টাকা ফেরত দিতে বলা হয়েছে।
সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ নিয়াজের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আরও বিস্ময়কর তথ্য মিলেছে। জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করা ছাড়াও আবেদনপত্র জমার নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই নিয়োগ পরীক্ষা হয়। তাঁর নিয়োগও অবৈধ। ফলে তাঁর নেওয়া ৩৪ লাখ ৮৬ হাজার ৩২৮ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত চাওয়া হয়েছে। একই অভিযোগ সহকারী শিক্ষক আ. রাজ্জাক ও মোহাম্মদ আলমগীরের নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও। ফলে আ. রাজ্জাকের কাছে ২৯ লাখ ৮১ হাজার ১২৮ ও মোহাম্মদ আলমগীরের কাছে ৩৪ লাখ ৯৬ হাজার ৩২৮ টাকা ফেরত চাওয়া হয়েছে।
সহকারী শিক্ষক দিলরুবা ও মোহাম্মদ আলামিনের ক্ষেত্রে ধরা পড়ে বেতন স্কেল সংক্রান্ত আর্থিক অনিয়ম। তারা সরকারী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড ডিগ্রি অর্জন না করা সত্ত্বেও অবৈধভাবে উচ্চতর স্কেল অনুযায়ী ২ লাখ ৩৮ হাজার টাকা উত্তোলন করেন। তাই এই অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত চাওয়া হয়।
জমিদাতা ও বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আলহাজ সুন্দর আলী জানান, প্রধান শিক্ষক আলতাফুর রহমানের অপকর্মের বিরোধিতা করায় সন্ত্রাসী লেলিয়ে দিয়ে তাঁকে মেরে তাঁর পা ভেঙে দেওয়া হয়। মামলা করেও প্রতিকার পাননি।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা জুলফিকার রহমান সাঈদ বলেন, ১৯৯৭ সালে তাঁর দাদার নামে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০০ সালের শেষ দিকে মোহাম্মদ আলতাফুর রহমান প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। এরপর থেকে বিদ্যালয়টি চালাচ্ছেন তাঁর মনগড়াভাবে। তাঁর ভাষ্য, ৫০ লাখ টাকা নিয়ে অফিস সহকারী, অফিস সহায়ক, পরিচ্ছন্ন কর্মী ও আয়া নিয়োগ দেন প্রধান শিক্ষক। এই টাকা দিয়ে বিদ্যালয়ের কোনো উন্নয়ন না করে শেরপুরে জমি কিনে ৫ তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে বাড়ি করেছেন। সেখানেই বসবাস করছেন তিনি। বিদ্যালয়ে না এসেও স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে প্রতি মাসের বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন।
ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সদস্য রতন প্রামাণিকের ভাষ্য, তাঁর সময়ে ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে ৩ জন কর্মচারী নিয়োগ দেন প্রধান শিক্ষক। সেই টাকা আত্মসাৎ করেন তিনি। এ ছাড়া নিজ এলাকায় জড়িয়ে পড়েন নারী কেলেঙ্কারিতে।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সৌরভ জানায়, ভর্তির পর থেকে আজও প্রধান শিক্ষককে দেখেনি সে। অষ্টম শ্রেণির মিজান ও দশম শ্রেণির শাকিল বলে, প্রধান শিক্ষক প্রায় দুই বছর ধরে স্কুলে আসেন না।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আরিফা আক্তার জানান, প্রধান শিক্ষক আলতাফুর রহমানের অপকর্মের কথা অধিদপ্তর থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত জানে। স্থানীয়ভাবেও অভিযোগ তদন্তে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে প্রধান করে কমিটি হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, তদন্ত কমিটির অন্যতম সদস্য উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মামুন অর রশিদ ওই প্রধান শিক্ষকের নানা অনিয়মের তথ্য গোপন করায় প্রকৃত সত্যটা জানতে পারেননি তিনি।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল ফয়সালের ভাষ্য, তদন্ত কাজে একাধিকবার বিদ্যালয়ে গিয়েও প্রধান শিক্ষককে পাওয়া যায়নি। বারবার নোটিশ দেওয়ার পরও তিনি বিদ্যালয়ে আসেননি। তদন্তে কোনো ধরনের সহযোগিতাও করেননি। তাঁর দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে না আসাসহ নানা অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছেন তারা। ইউএনওর কাছে প্রতিবেদন দিয়েছেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলতাফুর রহমানকে ফোন করলে তিনি সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। তবে সহকারী শিক্ষকদের পক্ষ থেকে দিলরুবা আক্তার বলেন, ‘আমরা যারা বেসরকারি কলেজ থেকে বিএড ডিগ্রি নিয়ে ১০ কোডে বেতন-ভাতা নিচ্ছি তা অবৈধ হলে ওই টাকা ফেরত দেব।’
ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ইউএনও নাজমুল হুসাইনের বক্তব্য নিতে গত বৃহস্পতিবার তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর সরকারি মোবাইল ফোনে কল দিলেও রিসিভ করেননি।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শামছুল আলম বলেন, আগে অডিট রিপোর্টের জবাব যেত জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে। তখন সরকারি কোষাগারে ফেরতযোগ্য টাকা জমা দেওয়ার পর জবাব গ্রহণ করা হতো। কিন্তু সম্প্রতি সেই নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। বর্তমান নির্দেশনা অনুযায়ী অভিযুক্তরা সরাসরি জবাব দেবেন অডিট অ্যান্ড নিরীক্ষা অধিদপ্তরে। জবাব সন্তোষজনক না হলে ব্যবস্থা নেবে মন্ত্রণালয়।
- বিষয় :
- দুর্নীতি
