ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্প

সন্দ্বীপবাসীর দুঃখ ঘোচে না ঠিকাদারের গাফিলতিতে

সাড়ে ৩ বছরের প্রকল্পের আড়াই বছরে কাজ হয়েছে মাত্র ১১ শতাংশ

সন্দ্বীপবাসীর দুঃখ ঘোচে না ঠিকাদারের গাফিলতিতে
×

 আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৮:৩৫ | আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ | ১২:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপকে বঙ্গোপসাগরের ভাঙন থেকে রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ তৈরি, কৃষি ও মৎস্য খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে ৫৬২ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। চারটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজ করার দায়িত্ব পেলেও তাদের গাফিলতির কারণে মেগা প্রকল্পে মেগা সংকট তৈরি হয়েছে। ঠিকাদাররা কাজ না করায় দুঃখ ঘুচছে না সন্দ্বীপবাসীর। 

প্রকল্পের আওতায় সন্দ্বীপে ২১ লাখ ব্লক দিয়ে শক্তিশালী বেড়িবাঁধ তৈরির কথা থাকলেও আড়াই বছরে ১ লাখ ব্লকও তৈরি করেননি ঠিকাদাররা। সাড়ে তিন বছর মেয়াদের প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

ঠিকাদার যথাসময়ে কাজ না করায় ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বরাদ্দের ১৩৫ কোটি টাকা সরকারের কোষাগারে ফেরত গেছে। মাসের পর মাস কাজ না করায় চারটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দ বাতিল ও কালো তালিকাভুক্ত করতে পাউবো থেকে একাধিকবার চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়। তারপর তিনটি প্রতিষ্ঠান তাদের প্যাকেজের কাজ শুরু করে। তবে প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি ২৬০ কোটি টাকার কাজ পাওয়া চতুর্থ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি নোটিশ পাওয়ার পরেও কাজ শুরু করেনি। বিশ্বাস বিল্ডার্স নামের প্রতিষ্ঠানটি আড়াই বছরে কাজ করেছে মাত্র ৬ শতাংশ।

২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর একনেকে পাস হওয়া প্রকল্পের পাঁচটি প্যাকেজে ওই বছরের ১৫ অক্টোবর ১৫০ কোটি ৭৪ লাখ টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। কাজগুলো পায় বিশ্বাস বিল্ডার্স। পরে আরও কাজ পায় প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৪ সালের ১৪ জানুয়ারি বিশ্বাস বিল্ডার্সের সঙ্গে পাউবোর চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি কাজ শুরুর কথা ছিল। প্রথম দিকে বাঁধে কিছু মাটি ফেলে লাপাত্তা হয়ে যায় তারা। বিশ্বাস বিল্ডার্স ছাড়াও এই প্রকল্পে কাজ পায় ই-ইঞ্জিনিয়ার্স কোম্পানি ১১১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা,  খুলনা শিপইয়ার্ড ৮৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং এমএম কনস্ট্রাকশন ৫৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। তারাও এখনও ৯০ শতাংশ কাজ করেনি। এই তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার নোটিশ দিলে তারা আড়াই মাস ধরে কাজ করছে। 

প্রকল্পের ৮৯ শতাংশ ভৌত কাজ এখনও বাকি। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না করায় গত দুই বছরে ১৭৫ কোটি টাকা অর্থ বরাদ্দ থাকলেও ঠিকাদারদের গাফিলতির কারণে সরকারি কোষাগারে ফেরত গেছে ১৩৫ কোটি টাকা। ২০২৬ সালে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও কাজ হয়েছে মাত্র ১১ কোটি টাকার। ২০২৫ সালে বরাদ্দ ছিল ১০০ কোটি টাকার, কাজ হয়েছে ১৫ কোটির। বাকি ৭৫ কোটি টাকা ফেরত গেছে। ২০২৪ সালে বরাদ্দ ছিল ৭৫ কোটি টাকা, কাজ হয়েছে ১৫ কোটি টাকার। ফেরত গেছে ৬০ কোটি টাকা।

প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, সন্দ্বীপের উরিরচরের ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার এলাকায় তীব্র ভাঙন রয়েছে। সেই ভাঙনরোধ করার পাশাপাশি প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সন্দ্বীপের কৃষি, মৎস্য ও সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। দ্বীপের মানুষের জীবনযাত্রা বদলে যাবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে শুধু ফসল উৎপাদন বাড়বে ২২ হাজার ২২১ টন। উপজেলায় ১৫ হাজার ২৮৭ হেক্টর ও উড়িরচরে ১১ হাজার ৪৪৬ হেক্টর ফসলি জমি আছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে ধান ও ৯ হাজার ৬৬৩ হেক্টর জমিতে শস্য উৎপাদন হয়। বর্তমানে এসব জমিতে এক লাখ দুই হাজার ৭৭৯ টন শস্য উৎপাদন হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর ফসল উৎপাদন বাড়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় এক লাখ ২৫ হাজার টন। কৃষি খাতের এ পরিকল্পনাও ভেস্তে গেছে ঠিকাদাররা প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট সময়ে না করায়। কারণ, দ্বীপের ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষই কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত।   

পাউবো চট্টগ্রাম-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজির সাইফ আহমেদ বলেন, প্রকল্পের বড় অংশের কাজের বরাদ্দ পেয়েছে বিশ্বাস বিল্ডার্স। তারা দুই বছর ধরে কাঙ্ক্ষিত কাজ না করায় একাধিকবার নোটিশ দিয়েছি। বাকি তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দিলে তারা কয়েক মাস ধরে ভালোভাবেই কাজ করছে। দুই বছরে প্রকল্পের ১১ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। 

সন্দ্বীপের উরিরচরের বাসিন্দা মফজল হোসেন বলেন, প্রতিবছরই ঘূর্ণিঝড় কিংবা সামুদ্রিক দুর্যোগে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হই। সাগর ভেঙে ফসলের জমি, ঘরবাড়ি নিয়ে যাচ্ছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে চুরমার হলেও নতুন বেড়িবাঁধ তৈরির খবর নেই। 

উরিরচরের কৃষক রাশেদ আলম বলেন, লবণাক্ত পানি জমিতে প্রবেশ করায় ধানসহ সবজি চাষ করলেও ভালো ফলন পাই না। সরকার নতুন বেড়িবাঁধ দেবে শুনেছি। বাঁধটি হলে আমাদের কৃষিকাজের অনেক লাভ হতো। শুধু বাঁধ না হওয়ায় ক্ষেত-খামারে কাজ করলেও লাভের চেয়ে ক্ষতি হচ্ছে। 

বিশ্বাস বিল্ডার্সের কর্ণধার নজরুল ইসলাম দুলালের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে সমকাল। তবে তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফিরোজুর রহমানের মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি। খুলনা শিপইয়ার্ডের প্রজেক্ট ইনচার্জ মশিউর রহমান বলেন, বর্ষা মৌসুমে সাগর উত্তাল থাকায় মালপত্র নিতে না পারায় কাজ করতে পারিনি। কয়েক মাস ধরে পুরোদমে কাজ শুরু করেছি আমরা।  
বাংলামার্ক ই-ইঞ্জিনিয়ারের তত্ত্বাবধায়ক মো. রফিক বলেন, আমরা কিছু সমস্যার কারণে আগে কাজ করতে পারিনি। এখনও পুরোদমে কাজ করছি। রয়েল অ্যাসোসিয়েটের ইনচার্জ মো. এমরান বলেন, আমাদের ৬০ হাজার ব্লক তৈরির কথা। আমরা ইতোমধ্যে ১১ হাজার ব্লক তৈরি করেছি। অন্য কাজও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। নানা সমস্যার কারণে আগে কাজ করতে পারিনি।
 

আরও পড়ুন

×