ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পুকুর-খামার দখলে নিতে ২ শিশুর নামে চাঁদাবাজির মামলা

পুকুর-খামার দখলে নিতে ২ শিশুর নামে চাঁদাবাজির মামলা
×

 বগুড়া ব্যুরো 

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ০৭:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

এক বিধবার পুকুর ও মুরগির খামার দখলে নিতে তাঁর স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া তিন সন্তানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দিয়েছে প্রতিপক্ষ। এরই মধ্যে পুলিশ ওই নারীর কলেজ পড়ুয়া বড় ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্য দুই সন্তান গ্রেপ্তারের ভয়ে স্কুল বাদ দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আর এর পেছনে থেকে কলকাঠি নাড়ছেন এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতা। 

গতকাল শনিবার বগুড়া প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন বগুড়ার কাহালু উপজেলার মালঞ্চা ইউনিয়নের বোলধর গ্রামের মৃত সোলাইমান আলীর স্ত্রী শাহনাজ পারভিন। তিনি জানান, তাঁর স্বামী প্রায় তিন বছর আগে মারা যাওয়ার পর স্বামীর রেখে যাওয়া পাঁচটি পুকুর ও একটি মুরগির খামারের আয় থেকে চার সন্তান নিয়ে তিনি জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাঁর এই পুকুর ও খামার অল্প মূল্যে বিক্রি করার জন্য চাপ দিতে থাকেন পার্শ্ববর্তী ধুনট উপজেলা বিএনপির সভাপতি তৌহিদুর রহমান মামুন। 

কিন্তু ওই বিধবা বিক্রি না করায় বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাসীদের দিয়ে পুকুর দখল ও এলাকা ছাড়ার হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন। বিএনপি নেতা মামুন মালঞ্চা ইউনিয়নে বেশ কিছু পুকুর লিজ নিয়েছেন এবং কিছু পুকুর কিনেছেন। তাঁর পুকুরগুলো দেখভাল করেন বগুড়া শহরের রহমান নগর এলাকার সোহাইব নামে এক যুবক। আর পুকুরগুলোর কেয়ারটেকারের দায়িত্বে আছেন লাল মিয়া নামের এক ব্যক্তি। 
শাহনাজ পারভিন বলেন, গত ২ মে রাতে আমাদের পুকুর থেকে মাছ চুরি করার সময় আমি এবং আমার বড় ছেলে মাছ ধরার জালসহ লাল মিয়াকে আটক করি। তাঁকে থানায় সোপর্দ করার সময় তিনি ক্ষমা চান এবং আর কখনও মাছ চুরি করবেন না বলে স্বীকারোক্তি দিলে তাঁকে ছেড়ে দিই। কিন্তু এ ঘটনাকে ভিন্নভাবে নিতে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে সোহাইব উল্টো বাদী হয়ে আমার ও আমার ছেলেদের বিরুদ্ধে কাহালু থানায় চাঁদাবাজির মামলা করেন। ৪ মে দায়ের করা মামলায় লাল মিয়ার কাছ থেকে আমি এবং আমার ছেলেরা চাঁদা দাবি করেছি; চাঁদা না দেওয়ায় তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর করেছি বলে উল্লেখ করেন। 
তিনি আরও বলেন, মামলায় আমার ২০ বছর বয়সের ছেলে একাদশ শ্রেণির ছাত্র আব্দুর রহমান তুহিনকে ২৬ বছর বয়স দেখিয়ে ১ নম্বর আসামি, দ্বিতীয় ছেলে ১৪ বছর বয়সের অঘোর মালঞ্চা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র আব্দুল আজিজ রাজাকে ২৪ বছর বয়স দেখিয়ে ২ নম্বর আসামি এবং তৃতীয় ছেলে পুলিশ লাইন্স স্কুল ও কলেজের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ১১ বছর বয়সের আব্দুল করিমকে ১৯ বছর বয়স দেখিয়ে ৪ নম্বর আসামি এবং আমাকে ৩ নম্বর আসামি করে। ছোট ছেলের বয়স এখন পাঁচ বছর। ওই মামলার বিষয়টি আমরা জানতাম না। কিন্তু পুলিশ ওই রাতেই আমার কলেজ পড়ুয়া ছেলে তুহিনকে ধরে জেলহাজতে চালান দেয়। 

সংবাদ সম্মেলনে ওই নারী বলেন, আমার অন্য ছেলে এবং আমাকে গ্রেপ্তারের ভয় দেখানো হচ্ছে। আমার অন্য ছেলেরা ভয়ে স্কুলে যেতে পারছে না, আমরা বাড়ি-ঘর ছেড়ে আত্মগোপনে আছি। বিএনপি নেতা মামুন পুলিশ এবং সন্ত্রাসীদের হাত করে আমাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই। সংবাদ সম্মেলনে ওই নারী তাঁর সন্তানদের জন্মসনদ ও বিদ্যালয়ের প্রত্যয়নপত্র দেখান।
এ ঘটনার বিষয়ে খোঁজ নিতে এলাকার একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে ওই নারীর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। কিন্তু বিএনপি নেতা মামুনের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চান না। 
স্থানীয় মালঞ্চা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নজরুল ইসলাম বলেন, সোলাইমানের মৃত্যুর পর তাঁর পুকুর ও খামার নিয়ে বিরোধ চলছে বলে শুনেছি। কিন্তু বিস্তারিত জানি না।
মালঞ্চা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নেছার উদ্দিন বলেন, আমি যতটুকু জানি বিধবা শাহানাজ পারভিন স্বামীর রেখে যাওয়া পুকুর ও মুরগির খামার পরিচালনা করে সংসার চালাচ্ছেন। তাঁর ছোট ছেলেরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে বলে কখনও শুনিনি। তাদের নামে আগের কোনো মামলাও নেই।

অভিযোগের বিষয়ে ধুনট উপজেলা বিএনপির সভাপতি তৌহিদুর রহমান মামুন বলেন, আমি ওই এলাকায় গত ৬ মাসেও যাইনি। কী হয়েছে আমি কিছুই জানি না। আমার পুকুর দেখাশোনা করে সোহাইব এবং লাল মিয়া। তাদের সঙ্গে কী হয়েছে তা আমার জানা নেই। আমার সঙ্গে ওই নারীর কোনোদিন কথা হয়নি। আমার বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগ মিথ্যা।
কাহালু থানার ওসি শফিকুল ইসলাম বলেন, মামলার তদন্ত করার দিনে ওই নারীর ছেলেরা বাড়িতে ছিল না। তাই তাদের সত্যিকার বয়স সম্পর্কে আমার জানা নেই। তবে তাঁর ছেলেরা কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকলে মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়া হবে।
পরিবারটিকে হয়রানির বিষয়ে বগুড়া পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ সমকালকে বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই, খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×