ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বর্ষা এলেই চরে বাড়ে ডাকাত আতঙ্ক

বর্ষা এলেই চরে বাড়ে ডাকাত আতঙ্ক
×

বগুড়া ব্যুরো  

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ০৮:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বগুড়ার সারিয়াকান্দির বাঙালি নদীর কাজলার চরের সাবেদুল ইসলামের নিজের জমি নেই। পাঁচজনের সংসার। চরের খাসজমিতে খুপরি ঘরে তাদের বাস। সাবেদুলের সম্বল দুটি গরু আর একটি মহিষ। সকাল-বিকেল ওই গরু-মহিষের দুধ বিক্রি করে বাজার থেকে সদাই কেনেন। 

বর্ষা মৌসুম না আসতেই গরু-মহিষ নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় তিনি। এর আগের বর্ষায় দুবার ডাকাত দল পাঁচটি গরু-মহিষ লুট করেছিল। ধারদেনা করে ফের গরু-মহিষ কিনে কোনো রকমে বাঁচার চেষ্টা করছেন। এবারও তাঁর মনে গরু-মহিষ লুটের আতঙ্ক। 
শুধু সাবেদুল নন, তাঁর মতো নদীভাঙনে বাড়িঘর হারানো ৫০০ পরিবার বিচ্ছিন্নভাবে বাস করেন সারিয়াকান্দির পাঁচ চরে। তাদের প্রধান আয়ের উৎস গরু-মহিষ পালন। 
চরের আরেক ভুক্তভোগী আফজাল হোসেন। দুই বছর আগে বর্ষার সময় তাঁর চারটি গরু ও দুটি মহিষ ডাকাত দল নৌকা নিয়ে এসে লুট করে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তাঁর আর গরু-মহিষ কেনার সামর্থ্য হয়নি। এখন অন্যের গরু-মহিষের খামারে দিনমজুরের কাজ করেন। 

আফজাল বলেন, গরু-মহিষ লুট করার পর আমি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারিনি। এখন অন্যের গরু-মহিষ বাথানে কাজ করে সংসার চালাচ্ছি। চরের মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা ডাকাতি।
জানা যায়, সারিয়াকান্দির ১২ ইউনিয়নের চারটি পড়েছে চরে। ইউনিয়নগুলো হলো– কাজলা, হাটশেরপুর, কামালপুর ও বোহাইল। সেখানে রয়েছে বিশাল চারণভূমি। এসব চারণভূমিতে আগে থেকেই প্রচুর পরিমাণে গরু-মহিষ পালন করা হয়। উপজেলার কাজলা ইউনিয়নের আমিনুরের তত্ত্বাবধানে বাথানে (খামার) চার খামারির গরু-মহিষ আছে ১০৬টি, একই ইউনিয়নের লিটন মিয়ার বাথানে পাঁচজন খামারির ১৮০টি গরু-মহিষ, হাটশেরপুর ইউনিয়নের শাহজাহানের বাথানে ১৫০টি মহিষসহ পুরো উপজেলায় প্রায় ১০টির বেশি বাথান রয়েছে। সাধারণত এক বাথান থেকে অন্য বাথানের দূরত্ব বেশ কয়েক কিলোমিটার। তাছাড়া চরে এক বাথান থেকে আরেক বাথানে নৌকা বা হেঁটে যাওয়া ছাড়া চলাচলের বিকল্প ব্যবস্থা নেই। তাই খামারিরা একজোট হয়েও ডাকাতদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন না। ডাকাত দলের হামলা থেকে বাঁচতে প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছেন ভুক্তভোগীরা। 

বাথানের মালিক শাহজাহান আলী বলেন, আমরা কয়েকজন মিলে গরু-মহিষের বাথান দিয়েছি। সেখানে বার্ষিক চুক্তিতে রাখাল রাখা হয়েছে। তবে ডাকাতদের অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ। বর্ষা মৌসুমে ডাকাতের কবল থেকে গরু-মহিষ রক্ষা করতে রাত জেগে পাহারা দিতে হয়। 
সারিয়াকান্দি থানা ও চরের কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে বর্ষা ও বন্যার সময় অন্তত ৩৭টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ছয়টি, ২০২২ সালে সাতটি, ২০২৩ সালে পাঁচটি, ২০২৪ সালে ১০টি ও ২০২৫ সালে ৯টি। ওই সব ডাকাতির ঘটনায় অন্তত ৩০০ গরু-মহিষ লুট করেছে ডাকাতরা। এসব ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে ১৮টি।
কাজলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, চরের অনেকেই গরু-মহিষ পালন করে সংসার চালান। তবে বর্ষা শুরু হলেই তাদের মধ্যে ডাকাত আতঙ্ক বিরাজ করে। চরে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের, ফাঁড়ি করলে ডাকাতির ঘটনা কমে যাবে। 
সারিয়াকান্দি থানার ওসি আ ফ ম আসাদুজ্জামান বলেন, আগে চরে ডাকাতির মতো বেশ কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। সাধারণত ভাটি এলাকা থেকে এসে কিছু দুষ্কৃতকারী এ ধরনের ঘটনা ঘটায়। এর কারণে বর্ষাকালে খামারিদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। নৌ পুলিশকে টহল ব্যবস্থা জোরদার করতে পরামর্শ দেওয়া হবে। পাশাপাশি বর্ষাকালে আমাদের থানা পুলিশকেও নৌকায় টহল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। 

আরও পড়ুন

×