ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিহঙ্গ কথা

রাম ঘুঘুর ছানা

রাম ঘুঘুর ছানা
×

চট্টগ্রামের হাজারীখীল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের গাছের ডালে রাম ঘুঘুর ছানা লেখক

ড. আ ন ম আমিনুর রহমান

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ০৯:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে চিড়িয়াখানা ও বুনো প্রাণীর চিকিৎসা বিষয়ে ব্যবহারিক পরীক্ষায় বহিঃস্থ পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য এসেছি। চট্টগ্রামেই যেহেতু এলাম, তাহলে এই জেলার ফটিকছড়িতে অবস্থিত বিখ্যাত হাজারীখীল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে একটু না গেলে কি হয়? কাল থেকে পরীক্ষা শুরু। কাজেই সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে ব্যাগপত্র রেখে দ্রুত নাশতা সারলাম। এরপর গেস্টহাউসের কেয়ারটেকার মতিউরকে সঙ্গে নিয়ে ফটিকছড়ির হাজারীখীলের উদ্দেশে বের হয়ে গেলাম। দুপুর পৌনে ১২টায় অভয়ারণ্যের টিকিট কাউন্টারের সামনে পৌঁছালাম। দুটি টিকিট কেটে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের ছড়ার দিকে পা বাড়ালাম। বিকেল সোয়া ৩টা পর্যন্ত ছড়ার বিভিন্ন স্পটে ১৪ প্রজাতির পাখি ও ১০ প্রজাতির প্রজাপতি-ফড়িং-বন্যপ্রাণীর ছবি তুলে ছড়া থেকে বেরিয়ে এলাম চা বাগানে পাখি খোঁজার জন্য। 

প্রচণ্ড রোদে টানা সাড়ে তিন ঘণ্টা ছড়ায় পাখি-প্রাণী খুঁজে খানিকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। তাই ছড়ার মুখে পরিত্যক্ত পিকনিক স্পটের একটি আধা-উন্মুক্ত গোলঘরের বেঞ্চিতে হাত-পা ছড়িয়ে বসলাম। কিন্তু মাত্র ১০ মিনিটও বিশ্রাম নিতে পারলাম না। কারণ, আমি যেখানে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম, তার উল্টো পাশের নাম না জানা চমৎকার লাল ফুলের গাছের ডালে একটি ঘুঘু পাখি এসে বসল। এর আগে বহুবার পাখিটির ছবি তুললেও কখনোই কম বয়সী পাখির দেখা পাইনি। কাজেই বিশ্রামের গুল্লি মেরে দ্রুত বেঞ্চি থেকে ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখলাম। মাত্র ৪৭ সেকেন্ড সময় পেলাম। এর মধ্যেই প্রয়োজনীয় ছবি তুলে চা বাগানের দিকে হাঁটা দিলাম। ১৭ এপ্রিল ২০২৬-এর ঘটনা এটি। এই প্রজাতির পাখি প্রথমবার দেখেছিলাম হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে, ২০১৪ সালের ২৭ মার্চে। 

চট্টগ্রামের হাজারীখীল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে দেখা কম বয়সী ঘুঘুটি এ দেশের এক দুর্লভ আবাসিক পাখি রাম ঘুঘু। রাজ ঘুঘু, কইতরে ঘুঘু বা গোলাপ ঘুঘু নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Oriental Turtle Dove বা Rufous Turtle Dove। কোলাম্বিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Streptopelia orientalis (স্ট্রেপটোপেলিয়া ওরিয়েন্টালিস)। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, চীন, রাশিয়া প্রভৃতি দেশে ওদের দেখা যায়। 

প্রাপ্তবয়স্ক রাম ঘুঘুর দেহের দৈর্ঘ্য ৩৩-৩৫ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ৫১-৫৫ সেন্টিমিটার ও ওজন ১৬৫-২৭৪ গ্রাম। একনজরে এটি একটি লালচে-বাদামি পাখি। মাথা নীলচে-ধূসর থেকে বাদামি-নীল, তার ওপর থাকে লালচে আভা। মুখমণ্ডলে গোলাপির আভা। ঘাড়-গলা ফ্যাকাশে হলদে থেকে ধূসর-গোলাপি। ঘাড়ের দুপাশে দুটি সাদা-কালো পট্টির মতো। ডানা-ঢাকনি ও ডানার পালক-ঢাকনির সব কালচে পালকের প্রান্ত লালচে হওয়ায় পিঠে আঁইশের মতো মনে হয়। লেজের প্রান্ত হালকা ধূসর। বুক-পেট ও দেহতল গাঢ় পীতাভ। লেজতল ফ্যাকাশে। চোখের রং কমলা। ঠোঁট ফ্যাকাশে নীলচে-গোলাপি। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল গোলাপি, নখ নীলচে। পুরুষ ও স্ত্রী বা পায়রা-পায়রি দেখতে একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা ও দেহতল পীতাভ-ধূসর এবং ডানা-ঢাকনি ও ডানার পালক-ঢাকনি ফ্যাকাশে পীতাভ। তা ছাড়া এদের 

ঘাড়ের ওপরের কণ্ঠিটি বড়গুলোর মতো ততটা স্পষ্ট নয়।
রাম ঘুঘু বাদাবন, উন্মুক্ত বন, আবাদি জমি ও বাগানে বিচরণ করে। সচরাচর জোড়ায় বা ছোট দলে থকে। এরা হেঁটে হেঁটে ঘাসবীজ, খাদ্যশস্য, আগাছা, সদ্য গজানো কচি পাতা ইত্যাদি খায়। পায়রা গলা ফুলিয়ে ‘ক্রু-ক্রু-ক্রু-ক্রুউ...’ শব্দে ডাকে।

মে থেকে জুলাই প্রজননকাল। এ সময় বাঁশবন, চারাগাছ বা ঝোপঝাড়ে কাঠিকুটি দিয়ে ঢিলেঢালা বাসা বানায়। বাসা বানানো, ডিমে তা দেওয়া ও ছানা লালনপালন পায়রা-পায়রি উভয়েই মিলেমিশে করে। পায়রি ডিম পাড়ে দুটি, রং সাদা; যা ফোটে ১৫-১৬ দিনে। ছানারা ১৫-১৭ দিনে উড়তে শেখে। আয়ুষ্কাল পাঁচ-ছয় বছর।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন

×