চট্টগ্রাম ও বগুড়া
জন্মনিবন্ধনের এক ফাইল পেতে চার ঘণ্টা
নাসির উদ্দিন হায়দার, চট্টগ্রাম ও এস এম কাওসার, বগুড়া
প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ | ০৮:৪৭ | আপডেট: ২০ মে ২০২৬ | ০৯:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন মো. সালমান। আগে তাঁর পরিবার ৭ নম্বর পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ডের বিবিরহাটে থাকত। এখন থাকে টেক্সটাইল এলাকায়। গত বছরের জুনে অনলাইনে জাতীয়তা সনদ সংশোধনের জন্য আবেদন করেছিলেন তিনি। গত রোববার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ড অফিস থেকে ফোনে তাঁকে জানানো হয়, তথ্যগত ত্রুটির কারণে তাঁর আবেদন বাতিল হয়ে গেছে, নতুন করে আবেদন করতে হবে।
সালমান পরদিন সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ড অফিসে গিয়ে জন্মনিবন্ধন সহকারী খাইরুন্নেছা খানমের কক্ষ তালাবদ্ধ দেখতে পান। তখন সচিব তোফায়েল আহমেদও উপস্থিত ছিলেন না। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে এই প্রতিবেদক সালমানের বিষয়টি সচিবকে জানালে জন্মনিবন্ধন সহকারী খাইরুন্নেছার কক্ষের তালা খুলে ফাইলটি খুঁজে বের করা হয়। চার ঘণ্টা পর ফাইল পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন সালমান। বিকেল ৪টা পর্যন্ত খাইরুন্নেছা আর অফিসে আসেননি।
দুপুর সাড়ে ১২টায় নাজিরপাড়া থেকে টিসিবি কার্ডের বিষয়ে জানতে আসেন গুলজার বেগম। তিনি বলেন, ‘আগের কার্ড জমা দিয়ে নতুন কার্ডের জন্য আবেদন করেছি। প্রতি সপ্তাহে একবার আসি। কবে কার্ড পাব, জানি না।’
এভাবে চসিক ৭ নম্বর পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ডে সেবা নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নাগরিকরা। বিশেষ করে জন্মসনদ, জাতীয়তা সনদ ও টিসিবির কার্ড সংগ্রহে বেশি কষ্ট পাচ্ছে মানুষ। জনপ্রতিনিধি না থাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসকের কাছে দৌড়াতে হয় ওয়ার্ড কার্যালয়ের কর্মচারীদের। এতে সময় ও অর্থ নষ্ট হয় বলে জানিয়েছেন তারা।
বিকেল ৩টার দিকে তিন মাসের সন্তানকে কোলে নিয়ে জন্মনিবন্ধনের আবেদন করতে আসেন সঞ্চিতা রানী দাশ। তখন নগর ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তা ও পরিচালক ইব্রাহিম খলিল রনির সামনে জনাবিশেক মানুষ নানা ধরনের আবেদন নিয়ে লাইনে দাঁড়ানো। এত মানুষ দেখে আবেদন না করেই ফিরে গেলেন সঞ্চিতা। এ সময় ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘সকাল থেকে এ পর্যন্ত ৪৫ জন মানুষকে সেবা দিয়েছি। অনলাইনে জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, চারিত্রিক, ওয়ারিশ, মৃত্যুসনদসহ অনেক আবেদন নিয়ে নাগরিকরা এসেছেন। সবাইকে সেবা দিতে গিয়ে এখনও দুপুরের খাবারও খেতে পারিনি।’
সোয়া ৩টার দিকে সচিব তোফায়েল আহমদকে তাঁর কক্ষে পাওয়া গেল। চসিকের একটি সভায় যোগ দেওয়ার কারণে তিনি অফিসে ছিলেন না বলে জানালেন। সচিবকে ঘিরে ধরেছেন কয়েকজন নারী, তারা টিসিবি কার্ডের জন্য এসেছেন। ইয়াসমিন আকতার নামের এক নারীর আবেদন পরীক্ষা করে সচিব জানালেন, তাঁর নম্বর দিয়ে তাঁর ভাই টিসিবি কার্ড নিয়েছেন। ফলে ইয়াসমিনের আর কার্ড পাওয়ার সুযোগ নেই। তোফায়েল আহমদ বলেন, ‘টিসিবির আবেদন নিয়ে বেশ ঝামেলায় আছি। কেউ একই ফোন নম্বর দিয়ে একাধিক আবেদন করেছেন। আবার কোনো আবেদনকারীর এনআইডির নামের সঙ্গে নিবন্ধিত ফোনের মালিকের নামের মিল নেই। এসব কারণে শত শত টিসিবি কার্ড আটকে আছে।’
হামজারবাগ থেকে আসা নেছার আহমেদ বলেন, ‘আগে কাউন্সিলর ছিলেন, তিনি স্থানীয়দের দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতেন। এখন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি কখন ওয়ার্ড কার্যালয়ে আসেন আর কখন যান, আমরা জানি না। তাই তাঁর সহযোগিতাও পাই না।’
অফিসে অনুপস্থিতি প্রসঙ্গে জন্মনিবন্ধন সহকারী খাইরুন্নেছা খানম বলেন, ‘ফাইলপত্র স্বাক্ষর ও শুনানির জন্য সপ্তাহে তিনবার আমাকে চসিকে যেতে হয়। গতকাল সকালে বৃষ্টির মধ্যেও যেতে হয়েছে। আমার আগে ৫ নম্বর মোহরা ওয়ার্ডের শুনানি ছিল। সেখানে অনেক সময় লাগায় বিকেলে আর অফিসে যেতে পারিনি।’
পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা প্রশাসক, চসিকের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে কুলসুম সমকালকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশনে নির্দিষ্ট কাজের বাইরে আমাকে তিনটি ওয়ার্ডের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। আমি প্রতি সপ্তাহেই একাধিকবার ওয়ার্ডগুলোতে যাই। তবে শুনানি চসিকেই করি। চেষ্টা করি মানুষকে দ্রুত সেবা দিতে।’
বগুড়া সিটিতেও সেবা পেতে ভোগান্তি
বগুড়া সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কালসিমাটি গ্রামের আবদুর রহমান ৩ এপ্রিল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন কৃষি অফিসের কর্মচারী। মৃত্যুসনদ না থাকায় পেনশনসহ সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছিল না পরিবার। আবদুর রহমানের স্ত্রী সালমা খাতুন কয়েক দিন ধরে সিটি করপোরেশনে যাচ্ছেন মৃত্যুসনদ নিতে। কিন্তু সিটি করপোরেশন থেকে তাঁর স্বামীর জন্মসনদ, বাড়ির হোল্ডিংয়ের কাগজ এবং পরিবারের সব সদস্যের জাতীয় পরিচয়পত্র চাওয়া হচ্ছে। একটা কাগজ জোগাড় করে দিলে আরেকটা চাওয়া হচ্ছে। সাত দিন ঘুরে সব কাগজ জোগাড় করে নিয়ে গেলে গত সোমবার জানানো হয়, বগুড়া সিটি করপোরেশন হওয়ায় অনলাইন কার্যক্রম বন্ধ আছে। প্রশাসক নিয়োগের পর নতুন সার্ভারে এসব কাজ অনলাইনে করা হবে। তবে কবে নাগাদ হবে, তা কেউ বলতে পারে না। বাধ্য হয়ে তিন ঘণ্টা বসে থেকে বাড়ি ফিরে যান।
সালমা খাতুন বলেন, ‘গত সোমবার থেকে ঘুরছি একটা মৃত্যুসনদের জন্য, কিন্তু দেওয়া হচ্ছে না। নানা ধরনের কাগজপত্রের কথা বলে শুধু ঘোরানো হচ্ছে। আজকে কাগজপত্র আনার পর বলছে, সার্ভার বন্ধ। অনলাইনে কাজ বন্ধ আছে। কবে হবে, তাও নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না।
একইভাবে বুধবার থেকে জন্মসনদের জন্য ঘুরছেন ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের মানিকচক গ্রামের রবিউল ইসলাম। তিনি তাঁর পঞ্চম শ্রেণিপড়ুয়া মেয়ের জন্মনিবন্ধন করাতে সিটি করপোরশনে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘আগে মা-বাবার জন্মনিবন্ধন তৈরি করে নিতে হবে, তারপর সন্তানের জন্মনিবন্ধন তৈরি করে দেবে। চার দিন ধরে ঘুরছি, কিন্তু দিতে পারছে না। আজকে বলছে, সার্ভার ডাউন; এখন আর হবে না।’
জানা গেছে, সিটি করপোরেশনে জন্ম, মৃত্যু, ওয়ারিশ সনদসহ যারা এসব কাজ করেন, তাদের সংখ্যা মাত্র দুজন। তাদের একজন আহসান হাবিব বলেন, শিশুদের জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে আগে মা-বাবার জন্মসনদ তৈরি করতে হয়। এর জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি প্রয়োজন হয় মা-বাবার। আর মৃত্যুসনদের ক্ষেত্রে আগে মৃত ব্যক্তির জন্মসনদ তৈরি করতে হয়। তার জন্য বেশ কিছু ডকুমেন্ট লাগে। এগুলো জোগাড় করতে বিলম্ব হয় বলে জন্ম ও মৃত্যুসনদ এবং ওয়ারিশ সনদ দিতে কিছুটা দেরি হয়।’ তিনি আরও বলেন, ১৪ মে বগুড়া পৌরসভাকে সিটি করপোরেশন করার জন্য গ্রেজেট প্রকাশ হয়েছে। ওই দিন থেকে সার্ভার বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আপাতত অনলাইনে সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, ১৪ তারিখ গেজেট প্রকাশ হওয়ার দিন থেকেই সার্ভার বন্ধ করেছে কর্তৃপক্ষ। প্রশাসক নিয়োগ হওয়ার পর সিটি করপোরেশন নামে সার্ভার চালু হলে আবার কার্যক্রম চলবে।
গেজেট প্রকাশের আগেও কাজের বিলম্ব হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রায় ১০ লাখ বাসিন্দা এ সিটি করপোরেশনে। এত লোকের সেবা মাত্র দুজন জনবলের পক্ষে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
- বিষয় :
- সিটি কর্পোরেশন
- জন্ম নিবন্ধন
- নিবন্ধন
- জন্মসনদ
