রাজবাড়ী পৌরসভা
পাঁচ হাজার টাকার গৃহকর বেড়ে ৭৩ হাজার
রাজবাড়ী পৌরসভা
সৌমিত্র শীল চন্দন, রাজবাড়ী
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৯:৩০ | আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ | ১১:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
শহরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সজ্জনকান্দার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমানের চলতি বছর পৌরকর নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৩ হাজার টাকা। বিগত পাঁচ বছর বার্ষিক কর দিতেন পাঁচ হাজার টাকা। এক লাফে প্রায় ১৫ গুণ কর ধার্য হওয়ায় রীতিমতো হতবাক তিনি।
তাঁর মতো রাজবাড়ী পৌর এলাকার অনেকেরই এমন অস্বাভাবিক কর ধার্য করায় চলছে আলোচনা-সমালোচনা। গত সোমবার কর কমানোর দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে নাগরিক কমিটি। তবে পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি চূড়ান্ত নয়। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আবেদন করলে আলোচনা সাপেক্ষে তা সংশোধন করা হবে।
সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমান জানান, তাঁর তিন তলা বাড়িটি ২০২২ সালে নির্মাণ করা হয়। বাড়িতে একটি পরিবার ভাড়া রয়েছে। গত পাঁচ বছর তিনি কর দিতেন পাঁচ হাজার টাকা করে। তার আগে ২০২০ সাল পর্যন্ত বার্ষিক কর দিয়েছেন চার হাজার টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় ৬০ হাজার জনসংখ্যার রাজবাড়ী পৌরসভায় হোল্ডিং সংখ্যা ১২ হাজারের মতো। এ পর্যন্ত সাড়ে ৩ হাজার জনকে হোল্ডিং ট্যাক্সের কাগজ দেওয়া হয়েছে; অনেকেরই অস্বাভাবিক কর নির্ধারণ করা হয়েছে। ১০ থেকে ১৫ গুণ পর্যন্ত কর নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ পৌর-১ শাখার বিধি অনুযায়ী পাকা ইমারত বাণিজ্যিক ৫শ ফুট পর্যন্ত ১৫শ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি বর্গফুট ২ টাকা; আবাসিকের ক্ষেত্রে ১ হাজার টাকা এবং পরবর্তী প্রতি বর্গফুট ১ টাকা ৫০ পয়সা; আধা পাকা বাণিজ্যিক ৫শ ফুট পর্যন্ত ১ হাজার টাকা এবং পরবর্তী প্রতি বর্গফুট ১ টাকা ২০ পয়সা; আধা পাকা আবাসিক ৬শ টাকা এবং প্রতি বর্গফুট ৭৫ পয়সা কর নির্ধারণের কথা বলা আছে।
রাজবাড়ী পৌরসভার কর শাখা সূত্র জানায়, কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণত দুটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। নির্মাণ ব্যয় অথবা ভাড়ার ভিত্তিতে। ইমারত/ভবনের আয়তন, ভবনের ধরন, এলাকার গুরুত্ব বিবেচনা করে বিধি অনুযায়ী প্রাথমিক খসড়া কর নির্ধারণ করা হয়। পরে কর পুনর্নির্ধারণ কমিটি শুনানির মাধ্যমে কর চূড়ান্ত করতে পারে।
এ শাখার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিগত পাঁচ বছর আগে প্রথম দফায় যে কর নির্ধারণ করা হয়েছিল, আবেদনের মাধ্যমে ওই কর কমিয়ে আনা হয়। এ বছর পাঁচ বছর আগের ধার্য করের ওপর ভিত্তি করে নতুন কর নির্ধারণ করা হয়েছে। উদাহরণ টেনে বলেন, পাঁচ বছর আগে এক ব্যক্তির কর নির্ধারণ করা হয় ৪৮ হাজার ৬শ টাকা। ওই ব্যক্তি তখন কর কমানোর আবেদন করেন। তৎকালীন মেয়র বা কাউন্সিলরের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে তা নামিয়ে আনেন ৭ হাজার ৮শ টাকায়। এ বছর কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর আগের প্রথম দফায় ধার্যকৃত কর অনুসরণ করা হয়েছে। এ বছর ইতোমধ্যে কর সমন্বয়ের জন্য আবেদন ফরম বিক্রি শুরু হয়েছে।
রাজবাড়ী শহরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাংবাদিক লিটন চক্রবর্তী জানান, তাঁর নির্মাণাধীন বাড়ি এখনও সম্পন্ন হয়নি। অথচ কর নির্ধারণ করেছে ৭৫ হাজার ৬শ টাকা। তাঁর ভাতিজা সাম্য চক্রবর্তী নতুন বাড়ি করছেন। সেটিও সম্পন্ন হয়নি। তাঁর কর নির্ধারণ করেছে ১ লাখ ১১ হাজার ৩৭৫ টাকা।
সজ্জনকান্দার বাসিন্দা মাশুক হেনা জানান, তাঁর টিনের ঘর। নতুন করে ঘর তিনি নির্মাণ করেননি। কর নির্ধারণ করেছে ৩৩ হাজার টাকা। আগে তিন হাজার টাকা কর দিতেন। তারও আগে দিতেন ৮শ টাকা।
একই এলাকার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কাজী মাহমুদা ইসলাম জানান, সব মিলিয়ে তাঁর মোট কর ধার্য করা হয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮০৫ টাকা। গতবার তারা কর দিয়েছিলেন ১২ হাজার ৫শ টাকা।
রাজবাড়ী পৌরসভার বাসিন্দা কর দেন এমন ১০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। তারা নাম প্রকাশে রাজি হননি। জানিয়েছেন, মেয়র-কাউন্সিলরের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক থেকেই কমানো হয়। সাধারণত ওয়ার্ড কাউন্সিলররা এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন।
এ বিষয়ে রাজবাড়ী নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফকির শাহাদত হোসেন বলেন, পৌর কর্তৃপক্ষের উচিত জনস্বার্থ বিবেচনায় কর পুনর্মূল্যায়ন করা এবং নাগরিকদের সঙ্গে আলোচনা করে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।
রাজবাড়ী পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহা. রবিউল হক বলেন, নতুন করে ঘরবাড়ি করলে কর বাড়ে। তবে এ নিয়ে সমস্যা হবে না। জনগণের সঙ্গে মতবিনিময় করা হবে।
রাজবাড়ী পৌরসভার প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. আশিক উন নবী তালুকদার সমকালকে বলেন, পৌরসভার যে আইন আছে, সেভাবেই কর নির্ধারণ করা হয়েছে। বাড়ির আয়তন, আর্থিক অবস্থা, সবকিছু বিবেচনা করা হয়। তবে এটাই চূড়ান্ত নয়।
