ঢাকা রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

রাজশাহীতে হামের প্রকোপ কমছে, ১৭ দিনে মৃত্যু নেই রামেকে

রাজশাহীতে হামের প্রকোপ কমছে, ১৭ দিনে মৃত্যু নেই রামেকে
×

ফাইল ছবি

রাজশাহী ব্যুরো

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ২০:২৬ | আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ | ২১:০০

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা কমে এসেছে। গত ১৭ দিন এই হাসপাতালে হাম উপসর্গ নিয়ে কোন শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। সর্বশেষ গত ৬ মে একজন শিশু মারা যায়। 

চিকিৎসকরা বলছেন, ‘ভিটামিন এ ক্যাপসুল হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য আশীর্বাদ। আক্রান্ত শিশুকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ালে মৃত্যু ও ভোগান্তি কমে যাচ্ছে। গত জুন ও জানুয়ারি মাসে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর নিয়মিত ডোজ শিশুদের দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি টিকারও সংকট ছিলো। এ কারণে মহামারি রুপ নেয় হাম। পাশাপাশি হামের টিকাদান কর্মসূচি চালু করায় হামের সংক্রমণ কমে এসেছে।’

রামেক হাসপাতালে কমেছে রোগী ও মৃত্যু

রামেক হাসপাতাল সূত্র বলছে, জানুয়ারিতে সংক্রমণ শুরু হয়। এরপর মার্চ মাসে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শুরুর পর থেকেই হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা করতে আসা শিশু রোগীর ভয়াবহ চাপের মুখে পড়েন হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা। শিশু ওয়ার্ডে  ২০০ টি বেডের বিপরীতে ভর্তি থাকতো অন্তত ৭০০ থেকে ৮০০ জন। এর মধ্যে দেড় শতাধিক থাকতো শুধু হামের উপসর্গ নিয়ে আসা। রাজশাহী বিভাগ ছাড়াও ঢাকা ও খুলনা বিভাগের কয়েকটি জেলার রোগীরা এখানে আসতো। এতে প্রচণ্ড চাপে পড়ে হাসপাতালটি। এক বেডে তিন থেকে চারজন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিলো। এতে করে সাধারণ ওয়ার্ডের অন্যান্য রোগীদের মাঝে আক্রান্ত শিশু হতে হাম ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। 

হামের ভয়াবহতায় এই মহামারিতে প্রায় প্রতিদিনই শিশু মৃত্যু ঘটতে থাকে। শুধু রামেক হাসপাতালেই এ পর্যন্ত মারা যায় ৫৭ শিশু। সর্বশেষ গত ৬ মে মারা যায় এক শিশু। এরপর ২৩ মে পর্যন্ত আর কোন শিশু হাম উপসর্গ নিয়ে মারা যায়নি। এ সময় চিকিৎসা নেন অন্তত এক হাজার ১৯ শিশু। মৃত ৫৭ শিশু বাদে সবাই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তবে আক্রান্ত শিশুদের মাঝে দীর্ঘ মেয়াদী নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, গত মার্চ-এপ্রিল মাসে সংক্রমণ যতটা ছড়িয়েছিলো, এরপর টিকাদান শুরু হবার এক মাসের মধ্যে সংক্রমণ কমে যেতে থাকে। গত ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গ নিয়ে মাত্র ৫ শিশু রামেক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। রোববার হাসপাতালে ভর্তি ছিলো ৭৩ জন। এর আগের দিন নতুন ভর্তি হয় ৪ জন। এসময় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৩ জন। এর মাত্র তিন সপ্তাহ আগে গত ১ মে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন ভর্তি রোগী ছিলো ১১৪ জন। 

রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, ‘হামের টিকাদান শুরুর পর নতুন রোগী ভর্তি কমেছে। এ সময় আক্রান্ত শিশুকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো সহ সঠিক চিকিৎসাদান করায় মৃত্যুহারও কমে এসেছে। আক্রান্ত ও মৃত শিশুদের ৭০ শতাংশ চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা। টিকাদানের পর সেখানেও কমেছে আক্রান্তের সংখ্যা।’

বিভাগে মারা গেছে ৮২ শিশু

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক অফিসের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত বিভাগের ৮ জেলায় হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৪ জন শিশু। উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরো ৭৮ শিশু। মৃত শিশুদের মধ্যে ৫৭ জন মারা গেছে রামেক হাসপাতালে। বগুড়ায় মারা গেছে ৮ জন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনায় মারা গেছে ৬ জন করে। নওগাঁয় একজন মারা গেছে। বিভাগে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ৯০৬ জন। হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫ হাজার ৫১৬ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫ হাজার ১৩২ জন। রোববার পর্যন্ত বিভাগের ৮ জেলায় ৩২৭ জন রোগী ভর্তি আছেন।

ভিটামিন এ ক্যাপসুল আশীর্বাদ

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিববুর রহমান বলেন, ‘গতবছর ২০২৫ সালের জুন এবং চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে শিশুদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর নির্ধারিত ডোজ দেয়া হয়নি। এ সময় সংকট ছিলো হামের টিকারও। আক্রান্ত শিশুদের সুস্থতায় ভিটামিন এ ক্যাপসুল জাদুর মতো কাজ করছে। পুষ্টিহীনতায় ভোগা শিশুরা হাম আক্রান্ত হলে তাদের মৃত্যু ঝুঁকি বেশি। আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় ভিটামিন এ ক্যাপসুল খুবই কার্যকর। যেসব শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে তাদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এতে শিশুদের মৃত্যু ঝুঁকি ও ভোগান্তি কমে আসছে।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘বিগত সময়ে টিকার কিছু সংকট ছিলো। এছাড়া গত বছরের জুনে এবং চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের ভিটামিন এ ক্যাপসুল শিশুরা পায়নি। সেসময় ভিটামিন এ ক্যাপসুল সরবরাহ ছিলো না। এ কারণে শিশুদের ঝুঁকি বেড়েছে। তবে এখন ভিটামিন এ ক্যাপসুল শিশুদের খাওয়াতে সরকারিভাবে নির্দশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আমাদের টিকাদানের যে লক্ষ্যমাত্রা ছিলো সেটাও আমরা শতভাগ অর্জন করেছি। এ কারণে হাম আক্রান্ত কমে আসছে। পাশাপাশি ভিটামিন এ ক্যাপসুল দেয়ায় মৃত্যু কমে এসেছে। ভিটামিন এ ক্যাপসুল মৃত্যু এবং ভোগান্তি দুটোই কমাচ্ছে।’ 

টিকাদানে ব্যাপক সাড়া

রাজশাহী বিভাগের হামের টিকাদান ১০৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। বিভাগের ৮ জেলায় এবার ২০ লাখ ৪৮ হাজার ৪৩৫ জন শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। শনিবার পর্যন্ত বিভাগের ২১ লাখ ১৪ হাজার ৬৪২ শিশুকে টিকাদান করা হয়। টিকার হার ১০৩ দশমিক ২৩ শতাংশ।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘হাম মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়লে মানুষ সচেতন হয়। সবাই নিজে থেকেই টিকা নিতে আগ্রহী হয়। আমাদের প্রচারণাও ছিলো। এতে করে টিকাদান কর্মসূচি লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যায়।’

আরও পড়ুন

×