তিন সীমান্তে আরও ৪২ জনকে পুশইনের চেষ্টা বিএসএফের
পুশইন ঠেকাতে শেরপুর সীমান্তে বিজিবির মাইকিং
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০২:১১
ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট ও মেহেরপুরে আরও ৪২ জনকে পুশইনের চেষ্টা করেছে বিএসএফ। শেরপুর ও পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সীমান্তে ১৭৬ জনকে পুশইনের জন্য জড়ো করা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁয় পুশইনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে শূন্যরেখায় আটকে থাকা ৪৫ জনকে সরিয়ে নিয়ে গেছে বিএসএফ। পঞ্চগড়ে শূন্যরেখায় অবস্থান করছে ১০ জন। কুষ্টিয়া সীমান্তে পুশইনের আড়ালে মানব পাচারের চেষ্টার অভিযোগ। সিলেট সীমান্তে সতর্কতামূলক মাইকিং করেছে বিজিবি।
ঠাকুরগাঁও সীমান্তে ১১ জনকে পুশইনের চেষ্টা করেছে বিএসএফ। আজ শনিবার ভোরে হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্ত দিয়ে তাদের এ দেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। তবে বিজিবির তৎপরতায় বিএসএফের পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। ৪২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মঈন হাসান জানান, পুশইন ঠেকাতে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জারি রয়েছে।
জয়পুরহাট সীমান্তে গত শুক্রবার রাতে ২৫ জনকে পুশইনের চেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে বিজিবি। এ ঘটনার পর সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা
জারির পাশাপাশি অতিরিক্ত জনবল ও টহল জোরদার করা হয়েছে। আজ বিকেলে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন জয়পুরহাট ২০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ লতিফুল বারী।
মেহেরপুরে ছয়জনকে পুশইনের চেষ্টা
মেহেরপুরের গাংনী সীমান্তে আজ শনিবার ভোরে নারী-শিশুসহ ছয়জনকে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবি ও গ্রামবাসীর প্রতিরোধের মুখে বিএসএফের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ছয়জন বর্তমানে শূন্যরেখায় অবস্থান করছে। এ ঘটনায় সীমান্তে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিজিবি। তেঁতুলবাড়িয়া বিজিবি ক্যাম্পের কমান্ডার সুবেদার হাবিবুর রহমান বলেন, নদীয়া জেলার করিমপুর থানার বেড় রামচন্দ্রপুর এলাকা দিয়ে গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া গ্রামের হাটপাড়ায় ছয়জনকে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবি ও গ্রামবাসীর প্রতিরোধের মুখে তারা ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
কুষ্টিয়া সেক্টর বিজিবির সহকারী পরিচালক মো. নুরুল হুদা বলেন, বিএসএফ তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পুশইনের চেষ্টা করছে। আমরা সতর্ক অবস্থানে দায়িত্ব পালন করছি। বিজিবি কোনোভাবেই তাদের গ্রহণ করবে না।
শেরপুর সীমান্তে ছয়জনকে জড়ো করেছে বিএসএফ
শেরপুরের নালিতাবাড়ী সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে ৪০০ গজ ভারতের অভ্যন্তরে চেরাংপাড়া নামক স্থানে ছয়জন লোককে জড়ো করেছে বিএসএফ। আজ শনিবার ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ নুরুল আমিন বায়েজীদ স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সব বিওপিতে জনবল বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে। সীমান্ত এলাকার জনসাধারণকে মাইকিং করে সচেতন করা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার সীমান্তে ১৭০ জন
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার বসিরহাট মহকুমার বিথারী হাকিমপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের হাকিমপুর চেকপোস্টে ১৭০ জনকে জড়ো করেছে বিএসএফ। তাদের যে কোনো সময় বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে। এসব ব্যক্তিকে বাদুড়িয়া স্বরূপনগর তিনটি হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর সীমান্ত থেকে ৪৫ জনকে সরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ী সীমান্তে পুশইনে ব্যর্থ হওয়ার পর শূন্যরেখায় দুদিন আটকে থাকা ২৮ জনকে সরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ। আজ শনিবার সকালে ওই স্থানে তাদের দেখা যায়নি। তবে তাদের ব্যবহৃত পোশাক ও ব্যাগ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
আনারপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমান জানান, শুক্রবার রাতে তিনটি ভারতীয় গাড়ি বাঙ্গাবাড়ী সীমান্তে অবস্থান নেয়। এর কিছুক্ষণ পর দুই দফা সীমান্তের লাইটগুলো ১০ মিনিটের জন্য নিভিয়ে দেয় বিএসএফ। এর পর থেকেই ওই ২৮ জনকে আর দেখা যায়নি। সকালে তারা সেখানে না থাকলেও তাদের ব্যাগ ও পোশাক এদিক-ওদিক পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কিছু জিনিস ও রান্নার উপকরণ তালগাছের পাতা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।
বিজিবি ১৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম প্রেস নোটে বলেন, সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে নোম্যান্স ল্যান্ডের ভারতীয় অংশের ৫০ গজ অভ্যন্তরে অবস্থান করছিল ওই ২৮ জন। কিন্তু শনিবার ভোর থেকে তাদের দেখা যাচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে, রাতের কোনো একসময় বিএসএফ তাদের ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ১৬ ব্যাটালিয়নের আওতায় পুরো সীমান্ত এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হয়েছে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার রাত ৩টার দিকে ২৮ জনকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় বিএসএফ।
এদিকে নওগাঁর সাপাহার সীমান্ত দিয়ে পুশইনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ১৭ জনকে সরিয়ে নিয়ে গেছে বিএসএফ। গত শুক্রবার রাত ২টার দিকে বিএসএফ সদস্যরা ওই ১৭ জনকে ভারতের অভ্যন্তরে নিয়ে যায়। আজ বিষয়টি নিশ্চিত করেন নওগাঁ ১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম।
এর আগে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সাপাহার উপজেলার হাঁপানিয়া সীমান্তের ২৩৮/এমপি সীমান্ত পিলার দিয়ে ১৭ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবির দৃঢ় অবস্থানের কারণে তাদের চেষ্টা সফল হয়নি।
নওগাঁ ১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। রাত ১টার দিকে বিএসএফ সীমান্তের লাইট বন্ধ করে দেয়। এরপর রাতের আঁধারে তারা পুশইনের চেষ্টা থেকে সরে গিয়ে ওই ব্যক্তিদের ভারতে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে ওই এলাকায় বিজিবির টহল জোরদার রয়েছে।
পঞ্চগড়ে শূন্যরেখায় ১০ জন
পঞ্চগড়ের বড়বাড়ি সীমান্ত দিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে ১০ জনকে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবির বাধার মুখে তারা ফেরত গিয়ে শূন্যরেখায় অবস্থান নেয়। তখন থেকে ওই ১০ জন সেখানেই অবস্থান করছে। এ ঘটনায় সীমান্তে বিএসএফ-বিজিবি মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে।
নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, বড়বাড়ি প্রধানপাড়া সীমান্ত দিয়ে বিএসএফ ১০ জনকে রাতের আঁধারে পুশইনের চেষ্টা করে। এ নিয়ে বিএসএফের সঙ্গে বৈঠক করা হলেও কোনো সুরাহা হয়নি।
কুষ্টিয়ায় পুশইনের আড়ালে মানব পাচারের চেষ্টা
একদিকে বিএসএফের পুশইনের চেষ্টা, অন্যদিকে সীমান্তকেন্দ্রিক মানব পাচার চক্রের সক্রিয়তা– দুই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর সীমান্তে দিনরাত কাজ করছে বিজিবি ও সীমান্তবাসী।
জানা গেছে, সীমান্ত এলাকায় মানব পাচার চক্র টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করছে। জনপ্রতি ৩০-৬০ হাজার টাকা নিয়ে এসব চক্র বাংলাদেশে প্রবেশের প্রস্তাব দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিজিবির কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও তারা বিভিন্ন কৌশলে সীমান্ত ব্যবহার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
৪৭ বিজিবির দায়িত্বপূর্ণ এলাকার মধ্যে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তের প্রায় ৪৬ কিলোমিটার এবং মেহেরপুরের গাংনী সীমান্তের প্রায় ৩৬ কিলোমিটার এলাকায় বিজিবি সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন বিওপিতে অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন করা হয়েছে, পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনও নজরদারি ও টহল কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে।
৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি বলেন, সীমান্তে পুশইন ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে এবং কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ বরদাশত করা হবে না। মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে।
সিলেট সীমান্ত এলাকায় বিজিবির মাইকিং
দেশের বিভিন্ন সীমান্তের মতো সিলেটেও পুশইনের চেষ্টা করছে বিএসএফ। গত বৃহস্পতিবার কোম্পানীগঞ্জের উৎমাছড়া সীমান্ত এলাকায় দুই ব্যক্তিকে পুশইন করার পর তাদের আবার পুশব্যাক করেছে বিজিবি। এরপর পুশইন ও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্ত এলাকায় মাইকিং শুরু করেছে বিজিবি। ৪৮ বিজিবির অধীন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় শুক্রবার রাতে মাইকিং করা হয়েছে।
৪৮ বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক জানান, তাদের দায়িত্বপূর্ণ এলাকার বিভিন্ন সীমান্ত ফাঁড়ির মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক মাইকিং করা হচ্ছে। পুশইন ও মানব পাচার প্রতিরোধের পাশাপাশি মাদক ও পণ্য চোরাচালান ঠেকাতে বিজিবির অভিযান এবং গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
