ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ছে হাছুর চ্যাপার সুখ্যাতি

বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ছে হাছুর চ্যাপার সুখ্যাতি
×

ছবি: সমকাল

মজুমদার প্রবাল, নান্দাইল (ময়মনসিংহ)

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ১২:২৭

চ্যাপা বা সিদল অনেকেই বানান, তবে হাছুর চ্যাপা স্বাদে-গন্ধে অনন্য। ময়মনসিংহ ও আশপাশের জেলায় এই চ্যাপা শুঁটকির সুখ্যাতি রয়েছে। বছরজুড়েই এই চ্যাপা শুঁটকির ভালো চাহিদা থাকে। তবে ঈদের ছুটিতে দূর-দূরান্তের মানুষ বাড়িতে এসে কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার সময় কিনে নিয়ে যান বলে হাছুর চ্যাপার বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

নান্দাইল উপজেলার সাভার গ্রামের দরিদ্র আব্দুল খালেক স্থানীয়দের কাছে হাছু মিয়া (৬৫) নামে পরিচিত। কর্মজীবনের শুরুতে মাছ বিক্রি করতেন তিনি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছ ব্যবসার ধকল তাঁর সহ্য হচ্ছিল না। তাই একসময় চ্যাপা শুঁটকির ব্যবসা শুরু করেন। প্রথম প্রথম বিভিন্ন স্থান থেকে শুঁটকি মাছ কিনে বিক্রি করলেও একপর্যায়ে ভিন্ন কিছু চিন্তা করতে থাকেন। সে অনুযায়ী দেশের ভাটি এলাকা থেকে পুঁটিমাছের শুঁটকি কিনে বিশেষ প্রক্রিয়ায় চ্যাপা তৈরি করতে থাকেন। দেখা যায় তাঁর তৈরি চ্যাপা বাজারের অন্য বিক্রেতাদের চ্যাপা থেকে স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় হচ্ছে। এভাবেই তাঁর চ্যাপা ‘হাছুর চ্যাপা’ নামে পরিচিতি পেতে থাকে।

আগে প্রতি শনি ও বুধবার নান্দাইল হাটের দিন চ্যাপা বিক্রি করতেন হাছু মিয়া। এখন শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বাজারের রওশন-ইছহাক মার্কেটের সামনে সামিয়ানা টানিয়ে চ্যাপা বিক্রি করছেন। দূর-দূরান্তে থাকা লোকজন ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসে বেশি করে হাছুর চ্যাপা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। হাছু মিয়া এক হাজার, ১২০০, ১৪০০ এবং ১৬০০ টাকা কেজি দরের চার ধরনের চ্যাপা বিক্রি করেন। সামর্থ্য অনুযায়ী চাহিদা মতো চ্যাপা কিনে নিতে পারেন ধনী-দরিদ্র সব ধরনের ক্রেতা।

গত শনি ও রবিবার নান্দাইল বাজারের রওশন-ইছহাক মার্কেটের সামনে গিয়ে দেখা যায়, হাছু মিয়ার সামনে বড় ডালা ঘিরে ক্রেতাদের ভিড়। ডালায় আকার ও দাম অনুযায়ী চার ধরনের চ্যাপা সাজানো রয়েছে। পাশেই চ্যাপা রাখার বড় দুটি মটকা খালি পড়ে রয়েছে। হাছু মিয়া ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী চ্যাপা মেপে মেপে দিচ্ছেন, সেগুলো পোটলা করে দিচ্ছেন তাঁর সহকারী আজিজুল ও সুশীল বর্মণ। পরিস্থিতি এমন হাছু মিয়ার সঙ্গে কথা বলার ফুসরত নেই। তবু ফাঁকে ফাঁকে কথা বলে জানা গেল, তিনি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অন্যদের চেয়ে বেশি দামে লবণ ছাড়া শুকানো পুঁটিমাছ মণ হিসাবে কিনে আনেন। বাড়িতে পরিবারের অন্যদের নিয়ে সেসব মাছ ভালো করে রৌদ্রে শুকান। এরপর মাটির গর্তে মটকা রেখে তাতে আঁটোসাঁটো করে শুকানো পুঁটিমাছ ভর্তি করেন। কিনে আনা তাজা পুঁটির তেল মাছের পরতে পরতে দিয়ে মাটি দিয়ে মটকার মুখ বন্ধ করে দেন। প্রতিটি মটকায় ৩০ থেকে ৩৫ কেজি পুঁটিমাছ ধরে। এভাবে একসঙ্গে অনেকগুলো মটকার মুখ বন্ধের পর সেগুলো গর্ত থেকে তুলে নির্দিষ্ট স্থানে ৬ থেকে ৭ মাস রেখে দিলেই চ্যাপা বিক্রির উপযোগী হয়।

হাছু মিয়া জানান, শুক্রবার বা ঈদের দিন ছাড়া প্রতিদিনই সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নান্দাইল বাজারে বসে চ্যাপা বিক্রি করেন। এভাবে প্রায় ২০ বছর ধরে চ্যাপা বিক্রি করছেন। প্রতিদিন তিনি ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার চ্যাপা বিক্রি করেন। সেই হিসাবে বছরে ৪৫ থেকে ৬০ লাখ টাকার চ্যাপা বিক্রি হয়। তাঁর ভাষ্য, অনেক প্রবাসী তাঁর কাছ থেকে দেড়-দুই কেজি করে চ্যাপা কিনে বিদেশ নিয়ে যান। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি চ্যাপা যায়। অনেকেই তাঁর কাছ থেকে চ্যাপা কিনে ফেসবুকে বা অনলাইনেও বিক্রি করেন। তাঁর চ্যাপার এত চাহিদার কারণ ব্যবসার খাতিরে বলতে চাননি। তবে রাসায়নিকমুক্ত খাঁটি উপকরণ এবং সঠিক পদ্ধতি মেনে তৈরি করেন বলেই তাঁর চ্যাপা এখন একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঈদের ছুটিতে বাড়িতে আসা পাঁচরুখি গ্রামের মেহেদী হাসান জানান, যখনই বাড়িতে আসেন তখনই হাছুর চ্যাপা  কিনে নিয়ে কর্মস্থলে যান। নিজে খান অন্যদেরও দিতে হয়। 

ঈশ্বরগঞ্জ থেকে চ্যাপা নিতে আসা উজ্জল মিয়া বলেন, ঈদের পরে তাঁর মালয়েশিয়া প্রবাসী ভাই চলে যাবেন। সেখানে অবস্থানরত লোকজন তাঁকে বেশি করে হাছুর চ্যাপা নিয়ে যেতে বলেছেন, তাই নিতে এসেছেন। খামারগাঁও গ্রামের কনু মিয়া জানান, দাম একটু বেশি হলেও হাছুর চ্যাপার স্বাদ-গন্ধ অন্য কোনো চ্যাপায় পাওয়া যায় না।

রওশন-ইসহাক মার্কেটের মালিক ও সাবেক পৌর মেয়র এএফএম আজিজুল ইসলাম পিকুলের ভাষ্য, স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় বলে সকলেই হাছুর চ্যাপার ভোক্তা। আগে তাঁর ক্রেতাদের কারণে বাজারে ভিড় লেগে যানজটের সৃষ্টি হতো। তাই তাঁর দোকানটি রওশন-ইসহাক মার্কেটের সামনে  স্থানান্তর করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

×