ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দখল করে স্থাপনা নির্মাণ

কক্সবাজার সৈকতে ‘সব ব্যবসায়ী কার্ড’ বাতিল

কক্সবাজার সৈকতে ‘সব ব্যবসায়ী কার্ড’ বাতিল
×

সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে স্থাপনা নির্মাণ

কক্সবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ২১:০৫

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে অস্থায়ীভাবে ব্যবসা পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসন থেকে দেওয়া সব কার্ড বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে নতুন করে কোনো কার্ড ইস্যু ও নবায়নও করা হবে না। চুক্তি লঙ্ঘন করে সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে স্থাপনা নির্মাণ করায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের পর্যটন সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার মো. মাহমুদুর রহমান সায়েম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

জানা যায়, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে বালিয়াড়ি দখল করে সহস্রাধিক দোকান নির্মাণ করা হয়। 

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ৯ মার্চ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এক সপ্তাহের মধ্যে সৈকতের সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১২ মার্চ জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়িতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ৯৩০টি দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদ করে।

উচ্ছেদের কয়েক দিন পর সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে পরিদর্শনে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, উচ্ছেদ করা বালিয়াড়িতে আর কোনো দোকান যেন না বসে, দখল না হয়, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশ সতর্ক থাকবে। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সেই নির্দেশনা অমান্য করে ঈদুল আজহার ছুটির সময় কতিপয় ব্যক্তি সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে চার শতাধিক দোকানপাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছে।

দখলদারদের অভিযোগ, তারা কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে রাজস্ব জমা দিয়ে অনুমতির মাধ্যমে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, গত ১২ মার্চ যৌথ বাহিনীর অভিযানে যেসব জায়গা থেকে দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছিল, ঠিক সেসব জায়গায় পুনরায় বসানো হয়েছে দোকানপাট। সুগন্ধা জামে মসজিদের পাশে বালিয়াড়ি দখল করে শতাধিক দোকানপাট বসানো হলেও কোনো দোকানে সাইনবোর্ড বা নাম নেই। দোকানমালিকের নাম পরিচয় জানাতে অনীহা প্রকাশ করেন কর্মচারীরা।

একটি দোকানের কর্মচারী রফিকুল ইসলাম বলেন, উচ্ছেদের বিরুদ্ধে দোকানমালিকেরা হাইকোর্টে রিট করেছেন। এরপর তারা (দোকানমালিকেরা) বালিয়াড়িতে নতুন করে দোকানপাট বসানো শুরু করেন। ১২ মার্চ উচ্ছেদের আগে এই দোকান টানা ১০ বছর এখানে ছিল। দোকানে কাপড়, আচার, চকলেটসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হচ্ছে।

পাশে ত্রিপলের ছাউনির নিচে ভ্যানগাড়ি দিয়ে বসানো কয়েকটি দোকানেও বিক্রি হচ্ছে শামুক-ঝিনুক, আচার, চা, পান-সিগারেট, প্রসাধনসামগ্রী ইত্যাদি। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সৈকত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জেলা প্রশাসনের নিয়োগকৃত একজন বিচকর্মী বলেন, ঈদের আগের রাত থেকে ঝুপড়ি দোকান বসানোর কাজ শুরু হয়। গত কয়েক দিনে চার শতাধিক দোকানপাট বসানো হয়েছে। সকাল সাতটা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত দোকানসমূহে বেচাবিক্রি চলে। বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) চেয়ারম্যান মুজিবুল হক বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে আবারও সংকটাপন্ন সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে শত শত অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ-পর্যটকসহ সাধারণ মানুষকে হতাশ করছে। এর দেখাদেখি অনেকে সুগন্ধা, কলাতলী, সিগাল পয়েন্টের বালিয়াড়ি ও ঝাউবাগান দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করছেন। এমনকি কলাতলী সৈকতের বালিয়াড়িতে সৃজিত সাগরলতা এলাকা ঘিরে সেখানে রেস্তোরাঁ তৈরি ও বাজার বসানো হয়েছে।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, প্রতিবছর কক্সবাজারে ঘুরতে আসেন ৭০ থেকে ৮০ লাখ পর্যটক। বেশির ভাগ পর্যটক একবারের জন্য হলেও সৈকতে নামেন। পর্যটকেরা সৈকতে নামার সময় বালিয়াড়িতে ঝুপড়ি দোকানের বস্তি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সেখানে নানা অপরাধও ঘটে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনার পর গত ১২ মার্চ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর সৈকতে মুক্ত পরিবেশ ফিরে এসেছিল। কিন্তু আবারও বালিয়াড়ি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করায় পুরোনো চেহারা ফিরে এসেছে। এ কারণে সন্ধ্যায় ও রাতে পর্যটকেরা সৈকতে নামতে অনীহা প্রকাশ করেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কয়েক দফা অভিযান চালিয়ে সুগন্ধা-কলাতলী-লাবণী পয়েন্ট থেকে ৯ শতাধিক স্থাপনা উচ্ছেদ করেছিলাম। এ ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও ছিল। সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত (উচ্ছেদ হওয়া) ব্যক্তিরা উচ্চ আদালতে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে রিট করেন। আদালত থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিটের জবাব দেওয়া হবে আদালতে।’

জেলা প্রশাসক বলেন, সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে অস্থায়ীভাবে ব্যবসা পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসন থেকে দেওয়া সমস্ত কার্ড বাতিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সাথে নতুন করে কোনো কার্ড ইস্যু ও নবায়নও করা হবে না। কারণ অনুমতি পত্রের চুক্তি লঙ্ঘন করে সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে স্থাপনা নির্মাণ করায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

×