জনবল সংকটে ধুঁকছে আলফাডাঙ্গা পৌরসভা
নাগরিক সেবায় ঘাটতি, অনুমোদিত পদ ৭৬ জনের, আছেন মাত্র ৯ জন
ফাইল ছবি
কাজী আমিনুল ইসলাম, বোয়ালমারী (ফরিদপুর)
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ১৬:৩২
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা পৌরসভা ২০১৬ সালের ১৬ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হয় । শুরুতেই এ পৌরসভাকে ‘খ’ বা দ্বিতীয় শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠার এক দশক পরও এ পৌরসভাটি জনবল সংকটে ধুঁকছে। এতে নাগরিক সেবায় নানা ধরনের ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শহর থেকে দূরে পৌর ভবনের অবস্থান হওয়ায় তা সাধারণ নাগরিকদের ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এদিকে পৌর শহরে সিসি ক্যামেরা না থাকায় শহরে বাড়ছে চুরি, ছিনতাইসহ নানাধরনের অপরাধজনক কর্মকাণ্ড। গত সোমবার একজন গণমাধ্যম কর্মী উপজেলা মসজিদে নামাজ আদায় করতে গেলে ওজুখানা থেকে তাঁর দু’টি মোবাইল ফোন চুরি হয়ে যায়। এর কয়েকদিন আগে সোনালী ব্যাংকের সামনে থেকে এক গ্রাহকের টাকা ছিনতাই হয়ে যায়। এ ছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে চুরি-ছিনতাই প্রায় নিত্য দিনের ঘটনা। অধিকাংশ সড়কে নেই সড়কবাতি। এ সুযোগে অপরাধীরা নির্বিঘ্নে চালাচ্ছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।
মোবাইল ফোন চুরি হওয়া গণমাধ্যমকর্মী ইকবাল হোসেন জানান, তাঁর প্রায় দেড় লাখ টাকা দামের দুটি মোবাইল সেট চুরি হয়েছে। আলফাডাঙ্গা উপজেলা পরিষদ, পৌর সদর বাজার, কেন্দ্রীয় মসজিদ, থানা, হাসপাতাল সড়কের কোথাও কোন সিসি ক্যামেরা বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। সিসি ক্যামেরা থাকলে চোরকে শনাক্ত করা হয়তো সহজ হতো। মোবাইল ফোনও উদ্ধার হতো।
পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী জাকারিয়া আলম সমকালকে জানান, ‘খ’ শ্রেণির পৌরসভায় অনুমোদিত পদ রয়েছে ৭৬ জনের। সেখানে মাত্র ৯টি পদে কর্মকর্তা কর্মচারী কাজ করছে, বাকি পদগুলোতে এখনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা (সচিব), উপসহকারী প্রকৌশলী, স্বাস্থ্য পরিদর্শকসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য রয়েছে। এ সকল পদে লোক না থাকায় পৌরসভার সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নাগরিকেরা। নতুন পৌরসভার ভবন নির্মাণ করা হয়েছে শহর থেকে ২-৩ কিলোমিটার দূরে কুসুমদি মাঠের মধ্যে। একজন নাগরিককে পৌরসভায় যেতে হলে ৫০ থেকে ১০০ টাকা অটো রিকশা বা ভ্যানভাড়া দিতে হয়। পৌরসভায় বয়স্ক বা শিশুদের জন্য নেই কোনো বিনোদনকেন্দ্র।
আলফাডাঙ্গার মানবাধিকার ও গণমাধ্যম কর্মী মো. আলমগীর হোসেন বলেন, পৌর এলাকায় ব্যাংকের সামনে থেকে গ্রাহকের টাকা ছিনতাই, হাসপাতাল গেটে চুরিসহ নানারকম অপরাধমূলক ঘটনায় প্রায়ই ঘটছে। কিন্তু অপরাধীদের দমনে প্রশাসন নির্বিকার। অতি দ্রুত আলফাডাঙ্গা পৌর এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং নষ্ট থাকা সিসি ক্যামেরা মেরামতের দাবি জানান তিনি।
আলফাডাঙ্গা সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি মোরাদ হোসেন তালুকদার বলেন, পৌরসভা কোনো প্রকার নাগরিক সুবিধা দিতে ব্যর্থ। বাজার বা শহরে কোন সিসি ক্যামেরা নেই, যাও কয়েকটা দেখা যায় তা অকেজো। পাশাপাশি অধিকাংশ সড়কে নেই সড়কবাতি। যে কারণে, সন্ধ্যা নামার পর মাদকাসক্ত, নেশাখোর, চোর-ছিনতাইকারীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। শিশু বা বয়স্কদের জন্য কোনো বিনোদন ব্যবস্থা না থাকলেও হ্যালিপ্যাড এলাকায় সন্ধ্যার পর উঠতি যুবকদের নেশার আড্ডা জমতে দেখা যায়। এসব ব্যাপারে পৌরসভা ও প্রশাসনের জরুরি পদক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
আলফাডাঙ্গা পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী জাকারিয়া আলম বলেন, জনবল সংকটের পাশাপাশি আর্থিক সংকটও রয়েছে। যে কারণে নষ্ট হওয়া সিসি ক্যামেরাগুলো মেরামত করা হচ্ছেনা। তবে শিগগিরই শহরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। সেখানেও একটা বড় সমস্যা আছে। শহর থেকে পৌর ভবন অনেকটা দূরে হওয়ায় কন্ট্রোল রুম স্থাপন নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন। এতো দূরে ক্যাবল নিলে ভালো রেজুলেশন না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। থানায় কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা যায় কিনা এ বিষয়ে ভাবছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জনবল নিয়োগ দিতে হলে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে করা যায়। সেক্ষেত্রে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকতে হয়। এখনতো প্রশাসক রয়েছে তাই নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। এসব সমস্যা নিয়ে সামনের পরিষদ মিটিংয়ে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আলফাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফকির তাইজুর রহমান বলেন, তিনি এখানে নতুন যোগদান করেছেন। পৌর এলাকায় সিসি ক্যামেরা না থাকা দুঃখজনক। সিসি ক্যামেরা থাকলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হয় এবং অবশ্যই অপরাধ কম সংঘটিত হয়। সিসি ক্যামেরা এবং সড়কবাতি স্থাপনের জন্য পৌর প্রশাসককে অনুরোধ জানানো হবে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
আলফাডাঙ্গার পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত নুর মৌসুমী বলেন, খুব দ্রুতই পৌরসভার স্থাপন করা নষ্ট সিসি ক্যামেরাগুলো মেরামত করা হবে। ঠিক করে দিবো। জনবল সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, পৌরসভার শূন্য পদে কেউ বদলি হয়ে আসতে চাইলে আসতে পারে। আমরা তাদের স্বাগত জানাবো। এটি ছোট এবং নতুন পৌরসভা; ধীরে ধীরে সব কিছুই হবে।
- বিষয় :
- ফরিদপুর
